প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষক। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সার, আবার সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ৫-৯ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ।
এ পরিস্থিতিতে সরকারি বরাদ্দের হিসাব ও কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বৈপরীত্য। কৃষকদের প্রশ্ন, বরাদ্দের পুরো সার জেলায় পৌঁছানোর পরও তা নির্ধারিত দামে বিক্রয় কেন্দ্রে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া সারের চাহিদার বিপরীতে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর ও মাগুরায় পুরো বরাদ্দই দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় চাহিদা ছিল ৬৮৭ টন, চুয়াডাঙ্গায় ১ হাজার ১৫৫, মেহেরপুরে ১ হাজার ২৭৪, রাজবাড়ীতে ১৪৬, ঝিনাইদহে ১ হাজার ৬৫, খুলনায় ২৮০, সাতক্ষীরায় ৪০১, নড়াইলে ২৪৭, যশোরে ১ হাজার ৩৮২ ও মাগুরায় ৫০০ টন। বরাদ্দও দেয়া হয়েছে সমপরিমাণ ইউরিয়া। সে অনুযায়ী, এসব জেলায় বড় ধরনের সংকট থাকার কথা নয়। তবে মাঠের কৃষকদের অভিযোগ, শুধু বরাদ্দের পরিমাণ পর্যাপ্ত হলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সেই সার সঠিক সময়ে, সঠিক ব্যবস্থাপনায় এবং সরকারি নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেটিও তদারকি জরুরি।
আমন ধান চাষের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় কুষ্টিয়ায় সারের চাহিদা ও সংকটের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগের মৌসুমে জেলায় ৮৮ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় তিন লাখ টন। চলতি মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ হচ্ছে।
আবাদি জমির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপির চাহিদাও বেড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ৫-৯ টাকা বেশিও নেয়া হচ্ছে।
কুমারখালীর বাঁশগ্রামের কৃষক রুস্তম আলী শেখ জানান, তাকে ডিএপি কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ২৬ টাকা এবং ইউরিয়া ৩২ টাকা দরে কিনতে হয়েছে। একই এলাকার আরেক কৃষক জানান, সার নিতে গেলে তাকে কয়েক দফা চার-পাঁচদিন পর আসতে বলা হয়েছে। পরে নির্ধারিত সময়ে বিক্রয় কেন্দ্রে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সার শেষ।
চলতি অর্থবছরে কুমারখালীতে উচ্চফলনশীল আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে ২ হাজার ২০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ কর্মসূচির বাইরে থাকা কৃষকদের মধ্যেই সার না পাওয়া এবং অতিরিক্ত দাম নেয়ার অভিযোগ বেশি।
বেশি দামে সার বিক্রির জন্য ডিলারদের দায়ী করেন কুমারখালীর খুচরা সার বিক্রেতা তপন। তার দাবি, পেঁয়াজ তোলার মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই ডিলাররা সারের সংকটের কথা বলে প্রতি বস্তায় সরকারি দামের চেয়ে ২০০-৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ফলে খুচরা বিক্রেতারাও বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক।
এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিলাররা। ওই এলাকার ডিলার শরিফুল ইসলাম জানান, তারা খুব সামান্য লাভে সার বিক্রি করেন। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত দামে প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ২৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ২৫০, ডিএপি ৯৫০ এবং এমওপি ৯০০ টাকা বিক্রি হয়। পরিবহন বাবদ ডিলাররা প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা পান বলেও জানান তিনি।
এ ডিলারের ভাষ্য, অনেক কৃষক বাকিতে সার নিয়ে ছয় মাস বা এক বছর পর টাকা পরিশোধ করেন। এ কারণে খুচরা বিক্রেতারা কেজিপ্রতি অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ টাকা নিয়ে থাকতে পারেন হয়তো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে কৃষকদের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। কোনো ডিলার বা সাব-ডিলার অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কিনা, সেটিও যাচাই করা হবে।’
মেহেরপুরে পরিস্থিতি আরো প্রকট বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে জেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ হাজার ৮০০ হেক্টর। কৃষকদের অভিযোগ, সারের সংকট, বিশেষ করে টিএসপির সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম।
সদর উপজেলার উজুলপুর গ্রামের কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত এক বস্তা সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। অনেকে আবার বেশি টাকা দিয়েও সার পাচ্ছে না।’
ওই এলাকার কলাচাষী আবেদ আলী জানান, তার আট বিঘা জমির জন্য আট বস্তা টিএসপি প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০ কেজি সার।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফিজ জানান, জেলায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংকট টিএসপিতে। বরাদ্দের এক-চতুর্থাংশ সারও তারা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন। তবে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
নিবিড় চাষাবাদের কারণেও সার সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা। তার ভাষ্য, মেহেরপুরে একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারবার চাষ হয়। এতে বাড়তি সার প্রয়োজন হয়। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
সার সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়। শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
চুয়াডাঙ্গায় সার বিতরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি ডিলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জেলার চারটি উপজেলায় বিএডিসি ও বিসিআইসি মিলিয়ে প্রায় ১২০ জন সার ডিলার রয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, এতসংখ্যক ডিলার থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকজন ব্যক্তি সার সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। একই ব্যক্তির বিএডিসি ও বিসিআইসি—দুই সংস্থার ডিলারশিপ থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডিলারদের অসাধু কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার।
রাজবাড়ী ও ঝিনাইদহেও সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারি হিসাবে সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে ইউরিয়ার চাহিদা ১৪৬ টন এবং ঝিনাইদহে ১ হাজার ৬৫ টন। দুই জেলাতেই চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ বরাদ্দের তথ্য দেয়া হয়েছে। যদিও মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন।
মাত্র দুই বিঘা জমিতে চাষ করা কৃষক রুহুল কুদ্দুস সালেহ জানান, বরাদ্দের হিসাব থাকলেও প্রয়োজনের সময় বিক্রয় কেন্দ্রে সার না পাওয়া গেলে তার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না। সার সংকটের কারণে তার পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান।
খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর ও মাগুরায়ও সেপ্টেম্বরে চাহিদার বিপরীতে পুরো ইউরিয়া বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। তবে শুধু বরাদ্দের পরিসংখ্যান দিয়ে কৃষকের কাছে সঠিক দামে সার পৌঁছেছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
দেশের অন্যতম বড় সার বাণিজ্য কেন্দ্র যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় গিয়ে সমস্যাটির আরেকটি চিত্র পাওয়া গেছে। গত এক সপ্তাহের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিউনিসিয়ায় উৎপাদিত কালো টিএসপি প্রতি বস্তা ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা, মিসরের টিএসপি ১ হাজার ৭০০ টাকা এবং মরক্কোর টিএসপি ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হয়। জর্ডানের ডিএপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬৫০ টাকা, চীনের ডিএপি ১ হাজার ৫৫০ ও এমওপি বিক্রি হয় ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়।
সার সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের আওতায় বেসরকারি আমদানিকারকদের আমদানি করা সারের বস্তায় উৎপাদনকারী দেশের নাম উল্লেখ থাকে। তবে বিএডিসির আমদানি করা সারের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী দেশের নাম থাকে না। কৃষকদের মধ্যে তিউনিসিয়ার কালো টিএসপির চাহিদা বেশি। এ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি আমদানিকারকরা পরিবেশকদের কাছ থেকে সার কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ।
যশোরে সার সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চলতি আমন মৌসুমে জেলায় কোনো ধরনের সারের সংকট নেই। কৃষকরা পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন এবং বেশি দামে সার কিনতে কৃষকদের বাধ্য করারও কোনো সুযোগ নেই।’