পিরোজপুরের বৈঠাকাটা, বেলুয়া নদীতে বাহারি পণ্যের সমাহার

ভোরের আলো যখন বেলুয়া নদীর শান্ত জলে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে শতাধিক নৌকার ডাক।

কেউ আনছে শাকসবজি, কেউ চাল-ডাল, কেউবা মাছ, হাঁস-মুরগি। নদীর বুকে যেন বেজে ওঠে এক অপূর্ব সংগীত। মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, ট্রলারের ইঞ্জিনের চিৎকার, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর ঢেউয়ের তালে জেগে ওঠে জনপদ। শত শত নৌকা আর ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় দেখলে মনে হবে নদীর বুকে ছোট একটি গ্রাম।

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীর বৈঠাকাটা ভাসমান হাটের স্বাভাবিক চিত্র এমন। বৈঠাকাটাকে বিবেচনা করা হয় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় নদীভিত্তিক হাট। এখানে সবজি, চারা, নাশতা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য—সবকিছু বেচাকেনা চলে নৌকার ওপরই। ১০ দশকের ঐতিহ্য বহন করা এ হাট এখন শুধু কৃষিপণ্যের পাইকারি কেন্দ্রই নয়; বরং এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান আর বাজার ব্যবস্থায় প্রধান মাধ্যম এ হাট। ফলে বেলুয়া নদী শুধু নৌকা বয়ে আনছে না, নিয়ে আসছে নানা মানুষের জীবনের গল্প। চাষী, ব্যবসায়ী, মাঝি, খেটে খাওয়া মানুষের সংস্থান নির্ভর করে এ বহমান স্রোতেই। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এ নদী বদলে যায় এক প্রাণচঞ্চল বাজারে। হাটবারে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বেচাকেনা। বর্ষায় সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত, আর শীতে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে লেনদেন। শত বছরের এ ভাসমান বাজারকে অ্যাগ্রো ইকো ট্যুরিজম হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনা জেলা প্রশাসনের।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাজিরপুরের বেলুয়া নদীর মোহনায় দূর থেকে তাকালে মনে হবে এখানে গড়ে উঠেছে থাইল্যান্ডের মতো কোনো ভাসমান বাজার। উপজেলার আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকায় ও ট্রলারে আসে বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য। সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় এখানের বেচাকেনা। কৃষিপণ্যের ওপর গড়ে উঠেছে ভাসমান এ বাজার। বৈঠাকাটার আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা এসে কেনেন এ পণ্য। গোপালগঞ্জ, বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি, ইন্দেরহাটসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা আসেন এ হাটে। এ অঞ্চলের মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ বাহন নৌকা। তাই এ নৌকাতেই গড়ে উঠেছে ভাসমান এ বাজার। এ বাজারে ভাসমান ভাতের হোটেল, নাশতা, চা-বিস্কুটসহ বিভিন্ন রকমের খাবারের দেখা মেলে নৌকাতেই।

সবজি বিক্রেতা রুস্তম আলী বলেন, ‘যত প্রকারের সবজি আছে সব এখানে পাইকারি বিক্রি হয়। এছাড়া সবজি ও সবজির চারা বিক্রি হয়।’

নারকেল ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, ‘আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারকেল ও ডাব এখানে বিক্রি করতে আসেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। তাদের থেকে কিনে আমরা ঢাকা-চট্টগ্রামের বিভিন্ন মোকামে পাঠাই। এখানে সবাই নৌকায় করে পণ্য নিয়ে আসেন।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, ‘পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের বৈঠাকাটার ভাসমান বাজারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চারাসহ কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়। ভাসমান বাজারে জেলার বাইরে থেকে পাইকাররা এসে পণ্য কিনে নিয়ে যান। বাজারটিকে অ্যাগ্রো ইকো ট্যুরিজম হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। এটা নিয়ে জেলা কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।’

আরও