বছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে ২৮৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল, সেখানে শুধু জুলাইতেই আক্রান্ত হয়েছে ৫৩৬ জন। অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসের তুলনায় জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাসে গড়ে ৪৭ জন আক্রান্ত হলেও জুলাইয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৭ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাইয়ে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু সংক্রমণ হঠাৎ বেড়েছে। আগামী কয়েক মাসে সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে। সেজন্য স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের আরো বেশি নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জেলা সিভিল সার্জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৬৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। শীতকাল হওয়ায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ কম থাকলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯ ও মে মাসে ৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত গড়ে মাসে ৩০ জন বা তার কম আক্রান্ত হয়েছে। তবে জুনে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। এ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২-এ। জুলাইয়ে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে।
চলতি বছরের শুরু থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৩৪ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীর ৩৩৮ জন, ১৫টি উপজেলার ৩৪১ ও অন্যান্য জেলার ১৫৫ জন। মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ। মোট ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ৭০১ জন সরকারি হাসপাতালে ও ১৩৩ জন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৯৯ এবং ৭৩৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। নগরী থেকে উপজেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াকে নতুন সংকট বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
চলতি বছর চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সীতাকুণ্ডে, ৮১ জন ও কর্ণফুলীতে ৫৭ জন। বাকি ১৩টি উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৯ থেকে সর্বনিম্ন পাঁচজন আক্রান্ত হয়েছে। মূলত এ দুই উপজেলা শিল্পাঞ্চল ও শ্রমঘন হওয়ায় সেখানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। এছাড়া কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাতে পানি জমে যাওয়া, ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং অন্যান্য কারণে এসব উপজেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাইয়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছিল। চট্টগ্রাম মেডিকেলসহ সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আলাদাভাবে চিকিৎসাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
তিনি জানান, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যা কমার প্রধান কারণ দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নতি। এখন মানুষ জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে যাচ্ছে। চিকিৎসকরাও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে সময়মতো পর্যবেক্ষণ, ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছেন। ফলে জটিলতা তৈরি হওয়ার আগেই অনেক রোগী সুস্থ হয়ে উঠছে।
এদিকে চমেকের ১৬ নম্বর ডেঙ্গু ওয়ার্ডে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ডের বেডগুলোয় ডেঙ্গু আক্রান্তরা চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। বেশির ভাগ রোগীই মশারি টানিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবে আক্রান্ত রোগীদের স্বজনরা জানান, ডেঙ্গু আক্রান্তদের শরীরে ব্যথা ও মাথা ঝিনঝিন করছে। রক্তের প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। সে কারণে চিকিৎসকরা হাসপাতাল ছাড়ার আগে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়েছেন।
চমেকের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সাইফুল ইসলাম আরজু বণিক বার্তাকে জানান, শুক্রবার পর্যন্ত চমেকে ৪১ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। গত জুলাইয়ে নতুন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ২০০ জনের অধিক চিকিৎসা নিয়েছে। বছরের শুরু থেকে সব মিলিয়ে ৪২৫ জন চমেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি হলে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে।