ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমে প্রত্যাশার পাশাপাশি হতাশাও রয়েছে —মির্জা ফখরুল

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে আগ্রহ ও প্রত্যাশা যেমন অনেক, তেমনি জনমনে হতাশা ও উৎকণ্ঠাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে আগ্রহ ও প্রত্যাশা যেমন অনেক, তেমনি জনমনে হতাশা ও উৎকণ্ঠাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা অব্যাহত আছে। সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও নিত্যনতুন এমন সব প্রস্তাব আসছে, যেগুলো রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সংসদ পরিচালনায় বিপুল প্রভাব ফেলবে। এসব প্রভাব ইতিবাচক হলে অবশ্যই তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে সম্পৃক্ত না করে তাদের প্রতিনিধিত্ব কিংবা প্রত্যাশার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের অধিকার কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা কমিশনের আছে কিনা, তা বিবেচনায় নিতে হবে।’

ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় বিএনপি আগ্রহী বলেই দলের প্রতিনিধিরা ধৈর্য ধরে আলোচনা শুনছেন এবং তথ্যপ্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশনকে সহযোগিতা করছেন বলে জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে যেমন ছয়টি সংস্কার কমিশনের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছি, তেমনি ঐকমত্য কমিশনের প্রতিদিনের আলোচনায় আমাদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে চলেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য আমাদের প্রতিনিধিরা সভায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং অনেক বিষয়ে ছাড় দিয়ে হলেও একমত হয়ে কমিশনের প্রয়াসকে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর সংস্কার কমিশনগুলো যেসব প্রস্তাব পেশ করেছেন, তার বিপরীত কিংবা নতুন নতুন প্রস্তাব উত্থাপন এবং তা নিয়ে অনেক সময় অচলাবস্থা সৃষ্টির কারণে কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে পুলিশ সংস্কার কমিশনের বিষয় এখনো আলোচনায় আসেনি। তবে ওই কমিশনের বিষয়ে আমাদের দলের প্রতিনিধিদের কাছে যতটুকু জেনেছি, তাতে র‌্যাব বিলুপ্তিসহ প্রায় সব বিষয়েই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। দুদক সংস্কার কমিশনে কতিপয় ছাড় দিয়ে ৪৭টি সুপারিশের ৪৬টিতেই আমরা সম্মতি জানিয়েছি। শুধু ২৯ নম্বর সুপারিশে আইনের মাধ্যমে করার পরিবর্তে আমরা আদালতের অনুমতি নেয়ার বিদ্যমান বিধান অব্যাহত রাখার কথা বলেছি। আমরা মনে করি, এটা না হলে দুদকের কার্যক্রমকে অহেতুক বিলম্বিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

অন্যান্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২০৮টি সুপারিশের মধ্যে ১৮৭টি প্রস্তাবে আমরা একমত হয়েছি এবং পাঁচটিতে আংশিক একমত হয়েছি। পাঁচটি সুপারিশে ভিন্নমত দিয়েছে। ১১টি প্রস্তাবে একমত হতে পারিনি—যেগুলো দেশে প্রদেশ সৃষ্টি, পদোন্নতি ও অন্যান্য প্রশাসনিক অসংগতির বিষয়ে। বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ৮৯টি সুপারিশের মধ্যে ৬২টি সুপারিশে আমরা একমত হয়েছি এবং নয়টিতে আংশিকভাবে একমত হয়েছি। ১৮টিতে ভিন্নমত পোষণ করে যুক্তিসহ পরামর্শ দিয়েছি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক সব প্রস্তাবে আমরা একমত হয়েছি।’

নির্বাচনী ব্যবস্থাবিষয়ক সংস্কার কমিশনের ২৪৩টি সুপারিশের মধ্যে ১৪১টিতে বিএনপি একমত হয়েছে বলে জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলটির মহাসচিব বলেন, ‘১৪টিতে আংশিকভাবে আমরা একমত হয়েছি। ৬৪টিতে ভিন্নমতসহ একমত হয়েছি। অর্থাৎ এসব বিষয়ে পরিবর্তনে একমত হয়ে বিভিন্ন আইনে ও বিধিতে সংশোধনী অধিকতর কার্যকর হবে তা প্রস্তাব করেছি। ২৪টি বিষয়ে আমরা একমত হতে পারিনি। নির্বাচনী ব্যবস্থাসংক্রান্ত ১২টি আইন ও ছয়টি নীতিমালা আছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও নির্দিষ্ট বিধান আছে। এসব প্রস্তাবের বেশ কয়েকটি বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং কয়েকটি নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে স্পষ্টতই বাধা সৃষ্টি করে, তাদের সাংবিধানিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে।’

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আনীত সব প্রস্তাবে বিএনপি একমত হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আইনি সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের ১৩১টি সুপারিশে আমরা দফাওয়ারি মতামত দিয়েছি। অধিকাংশ সুপারিশে একমত হয়েছি। ‘৭০’ অনুচ্ছেদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ—এ দুই বিষয়েই আমরা ছাড় দিয়েছি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেয়ার বিধান বিশ্বের কোথাও না থাকার পরও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আমরা সম্মত হয়েছি।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও নজরুল ইসলাম খান।

আরও