২০১৮ সালে চালু হওয়া সিলেটের একমাত্র বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র এখন ধ্বংসের পথে। শুরুতে ৬২টি প্রাণী নিয়ে কেন্দ্রটি চালু হলেও এখন অধিকাংশ প্রাণীই মারা গেছে। এর কারণ হিসেবে বন বিভাগের চরম অব্যবস্থাপনা ও খামখেয়ালিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। গেটের ইজারাদার পক্ষ দাবি করছে, এটি নামেই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র। দর্শনার্থীরা টিকিট কেটে ঢুকে বের হয়ে যাওয়ার সময় হতাশ হয়ে ফেরেন। অন্যদিকে বন বিভাগ বলছে, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে সিলেটের টিলাগড় ইকোপার্কের ভেতর গড়ে তোলা হয় এ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটি। প্রায় ৬২টি প্রাণী নিয়ে এটি চালু হলেও নানান অব্যবস্থাপনায় মারা গেছে অধিকাংশ প্রাণী। এমনকি একমাত্র হরিণ ছাড়া আর কোনো প্রাণীই বাচ্চা দেয়নি।
সরজমিনে সিলেট নগরীর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন টিলাগড় ইকোপার্ক বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে চোখে পড়ে চরম অব্যবস্থাপনার দৃশ্য। ইকোপার্কের সার্বিক তদারকি ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যা এখন অত্যন্ত হতাশাজনক। পার্কে দর্শকদের দেখার মতো তেমন কোনো প্রাণীই আর অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে পুরো পার্কে মাত্র দুটি অজগর, দুটি ময়ূর, গুটিকয়েক হরিণ, দুটি মেছোবিড়াল, ম্যাকাও, ধূসর তোতা, কালিম পাখিসহ নামমাত্র কিছু প্রাণী রয়েছে। আগে এখানে যে জেব্রা ও অন্যান্য প্রাণী ছিল, উপযুক্ত পরিচর্যা ও তদারকির অভাবে সেগুলোর মৃত্যু হয়েছে। যেসব প্রাণী বেঁচে আছে, তাও দেখার মতো নয়। ময়ূর পেখম তোলে না। একটি বড় ও অন্যটি ছোট অজগর। পশুপাখিদের নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পরিবেশন করা হয় না। মুরগির ফিড খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে প্রাণীগুলোকে। এছাড়া সেখানে কোনো ভেটেরিনারি সার্জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। একটি সার্জিক্যাল বেড পর্যন্ত নেই সেখানকার প্রাণী হাসপাতালে। আর প্রাণীগুলোকে খাঁচায় এমনভাবে রাখা হয় যে সেখানে বাঁচাই সম্ভব নয়। এছাড়া কেন্দ্রের ভেতরে গাড়ি চলাচল করাটা প্রাণীদের জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র ঘুরতে এসেছিলেন এমসি কলেজের শিক্ষার্থী মাহবুব ও মুনিরা। তাদের ভাষায়, এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা। খাঁচাগুলো শূন্য পড়ে আছে। যেসব প্রাণী আছে, তা দেখার মতো নয়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা থাকা থেকে না থাকাই ভালো।’
ইজারাদার পক্ষের ম্যানেজার তারেক আহমদ বণিক বার্তাকে জানান, ইকোপার্কের মূল দায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণ বন বিভাগের হাতে থাকলেও তারা ঠিকমতো দেখভাল করছে না। খাঁচাগুলো জরাজীর্ণ, নেই পর্যাপ্ত প্রজনন বা ডিম ফুটানোর মতো বাক্সের ব্যবস্থা, যার ফলে সাপের বা অন্য প্রাণীর ডিমও টিকছে না। কালিম পাখির মতো প্রাণীদের মাছ বা উপযুক্ত খাবার না দিয়ে কেবল মুরগির ফিড দেয়া হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের পরিপন্থী।
সিলেট রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার মো. নাজমুল ইসলাম দাবি করেন, ইকোপার্কটির আধুনিকায়ন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছিল। ইকোপার্কের ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রধান সড়ক চলে যাওয়ার কারণে যানবাহন ও মানুষের চলাচল, ধুলাবালি এবং শব্দদূষণের ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশ সুরক্ষা ও বন্যপ্রাণীর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে পার্কের বাইরের জমি অধিগ্রহণ করে সড়কটি ইকোপার্কের পাশ দিয়ে ঘুরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও প্রস্তাবনা ও আলোচনা চলছে। সড়কটি বাইরে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হলেই ইকোপার্কের সার্বিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।
তিনি আরো বলেন, ‘পার্কটির মূল প্রবেশ মূল্য সংগ্রহের জন্য প্রতি বছর টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা দেয়া হয়। আমরা আশা করছি, গৃহীত মাস্টারপ্ল্যানটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে টিলাগড় ইকোপার্কটিকে আরো উন্নত ও বন্যপ্রাণীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’