হঠাৎ করেই উপকূলীয় জেলা বরগুনা ও বরিশালে বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত সাড়ে পাঁচ মাসে বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ। আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে মৃত্যুও। বরগুনাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোয় নোনাপানি সহনশীল এডিস মশার বৃদ্ধিই এর কারণ বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ব ও অনুপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা ১৯টি। এগুলো হলো বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এসব জেলায় ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগসহ অন্যান্য ব্যাধির প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে দুই দশক ধরে গবেষণা করেছিলেন গবেষকরা। সম্প্রতি এ জেলাগুলোয় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তি চট্টগ্রাম বিভাগের। এ সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে। এ বিভাগের হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হয়েছে ১০১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮, ঢাকা বিভাগে পাঁচ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৯ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬ জন।
গতকাল পর্যন্ত চলতি বছর মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৭৩৯ জন। এর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ ও ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের। এর আগে শুক্রবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়, যা চলতি বছরে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শনাক্ত ডেঙ্গু রোগীর অর্ধেকই বরিশাল বিভাগের। এ বিভাগে গতকাল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৮৯ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বিভাগের মধ্যে বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি। এ প্রবণতা গত বছরও ছিল। এ বছর আরো বেশি দেখা যাচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য বার্তা প্রচার করে মশার আবাস ধ্বংস করতে এবং কোথাও বদ্ধ পানি না রাখতে বলছি। এটা করা না গেলে একসময় হাসপাতাল রোগী ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।’
গত ২৪ এপ্রিল ন্যাচার ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূলীয় এলাকায় নতুন আতঙ্কের নাম উঠছে নোনাপানির মশা। সমুদ্রের নোনাপানি ও নদীর মোহনায় জন্ম নেয়া এসব মশা রোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে মিঠাপানির মশার চেয়েও ভয়ংকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
নোনাপানির মশার বংশবৃদ্ধি সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এখনো মিঠাপানির মশা নিধনে। নোনাপানির মশা নিধনের বিষয়টি উপেক্ষার ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এতে নোনাপানিও যুক্ত হচ্ছে। নদীগুলোর নোনাপানি লোকালয়ের অনেক ভেতরে চলে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে উপকূলবর্তী এলাকায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, পীত জ্বর ও ম্যালেরিয়ার বাহক মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। পাশাপাশি নোনাপানিতে বসবাস ও বংশবিস্তার প্রক্রিয়া দ্রুততর হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলোয় আশঙ্কাজনক হারে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পেছনে এডিস মশার অভিযোজনের সম্পর্ক রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এডিস মশার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি স্বচ্ছ পানিতে জন্মে। লবণাক্ত পানিতে এডিস মশা জন্মানোর কথা নয়। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশের লোনাপানিতে এডিস মশার অভিযোজনের বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আরো বিস্তর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মশাসহ সব প্রাণীর মধ্যেই এক ধরনের অভিযোজনক্ষমতা তৈরি হয়। লোনাপানিতে জন্ম ও ভাইরাস বহনেরও ক্ষেত্রে মশাও সহনশীল হয়ে উঠেছে।’
লোনাপানি সহনশীল এডিস মশার কারণে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঢাকা আর ঢাকার বাইরের মশার প্রকৃতি এক হবে না। আবার মিঠাপানি ও নোনাপানির মশার বৈশিষ্ট্যও এক হবে না। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রকে কাজ শুরু করতে হবে। আমাদের দেশের ভাইরাস প্রতিরোধ ও মশা নিধন পদ্ধতি অনেক ত্রুটিপূর্ণ। এ পদ্ধতিতে মশা ও ভাইরাস কোনোটাই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। নোনাপানির মশা নিয়ন্ত্রণেও যদি ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ হয়, তাহলে দেশের মশক ব্যবস্থাপনা লেজেগোবরে হয়ে উঠবে।’
ন্যাচার ইন্ডিয়ার গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালের এশীয় সুনামির পর ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি নিয়ে অনুসন্ধানের সময় তামিলনাড়ুর গ্রামগুলোয় সমুদ্রের পানিতে অ্যানোফিলিস ও কিউলেক্স মশার প্রজনন দেখতে পায়। বিষয়টি বিজ্ঞানীদের রীতিমতো অবাক করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি ডেঙ্গু রোগের প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টি মশা লবণাক্ত ও ঈষৎ লবণাক্ত উভয় পরিবেশেই ডিম পাড়তে এবং লার্ভা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মশায় পরিণত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেফালী বেগম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লবণাক্ত পানিতে এডিস মশার অভিযোজনের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। উপকূলীয় এলাকাগুলোয় ডেঙ্গু ছড়ানোর আরো কারণ থাকতে পারে। গত বছরই আমরা সতর্ক করেছিলাম ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে। অনেক কারণেই ডেঙ্গু ছড়াতে পারে। একটা কমন কারণ হলো ঢাকা থেকে ঢাকার পাশের জেলায়, সেখান থেকে তার পার্শ্ববর্তী জেলায়—এভাবে ছড়াতে ছড়াতে ক্রমান্বয়ে এটা এখন উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।’
ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় সরকার ঢাকার বাইরে সেভাবে নজর দেয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এত বছর ডেঙ্গু ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। মশা নিধনে ঢাকায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বাইরে থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছিল। এখন সময় এসেছে ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। তাছাড়া উপকূলীয় এলাকাগুলোয় কেন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে এবং সেখানে মশা নিধনের পদ্ধতি কেমন সেটা নিয়েও রাষ্ট্রকে এখন কাজ করতে হবে। আমরা যারা একাডেমিকভাবে কাজ করি, তারাও বিষয়টি নজরে রাখব।’
বরগুনার সার্বিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘এ জেলায় চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে পাঁচজন। কীটতত্ত্ববিদদের বক্তব্য হলো আগে এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মাত। এখন অপরিষ্কার পানিতেও জন্মায়। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলো এখন ডেঙ্গুর জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বৃষ্টি, বাতাসের আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ—এগুলো এডিস মশার বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করছে।’