যদিও মে মাসে এককভাবে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেড়েছে, তবু পাঁচ মাসের সামগ্রিক চিত্র এখনো নেতিবাচক। একই সময়ে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া তাদের রফতানি বাড়িয়েছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ বাজারে বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটিইএক্সএ) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৩৫৩ কোটি ৩ লাখ ডলারের পোশাক আমদানি করে। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ৩২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ থেকে ২৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পোশাক কম আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৬৩৯ কোটি ৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ৬২৯ কোটি ৮৭ লাখ ডলার ছিল। কম্বোডিয়া থেকে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জানুয়ারি-মে সময়ে চীন থেকে পোশাক আমদানি ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ভারত থেকে কমেছে ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিল ভিয়েতনাম। দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। এরপর রয়েছে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও কম্বোডিয়া। তবে মে মাসের চিত্র বাংলাদেশের রফতানি ইতিবাচক ছিল। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেড়ে ৫৪ কোটি ৮৮ লাখ থেকে ৫৮ কোটি ২০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর বিশ্বব্যাপী মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
ওটিইএক্সএর তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশী পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ২ শতাংশ কমেছে। প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের ইউনিট মূল্যে সবচেয়ে বেশি ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ পতন হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের ইউনিট মূল্য ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৬ দশমিক ৭৮ ও ভারতের কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে মেক্সিকোর ইউনিট মূল্য ৮ দশমিক ৩১ ও হন্ডুরাসের ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির গড় ইউনিট মূল্য প্রায় অপরিবর্তিত ছিল।
অর্থমূল্যের পাশাপাশি পরিমাণগত (বর্গমিটার) হিসাবেও বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনাম থেকে আমদানির পরিমাণ ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, কম্বোডিয়া থেকে ১৮ দশমিক শূন্য ৩ ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে চীন থেকে আমদানির পরিমাণ ২৯ দশমিক ৬৭ ও ভারত থেকে ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমেছে।
ওটিইএক্সএর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির অর্থমূল্য ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, পাকিস্তান, মেক্সিকো ও হন্ডুরাস থেকে পোশাক আমদানি কমেছে। তবে মে মাসে বাংলাদেশের রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাওয়ায় আগামী মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির গতি কিছুটা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমাও বৈশ্বিক এ প্রবণতারই প্রতিফলন। এছাড়া তুলনা করা হচ্ছে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ের তথ্য। গত বছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক (রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ) কার্যকরের আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা আগাম চালান (অ্যাডভান্স শিপমেন্ট) নিয়েছিলেন। ওই সময়ের অস্বাভাবিক উচ্চ আমদানির কারণেই চলতি বছরের পরিসংখ্যানে তুলনামূলকভাবে বড় পতন দেখা যাচ্ছে।’
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো ভালো করার বিষয়ে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে। এর কারণ দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়েছে, ফলে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এ বিষয়ে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) থাকায় প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানায়নি। কম্বোডিয়া বাংলাদেশের তুলনায় আরো অনুকূল শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি চীন থেকে স্থানান্তরিত বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) পণ্যের উল্লেখযোগ্য অর্ডার পেয়েছে ভিয়েতনাম। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি-মে সময়ে দেশের নির্বাচন-পরবর্তী সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে ক্রেতারা নতুন কার্যাদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক ছিলেন। একই সময়ে দুটি ঈদের ছুটিও রফতানির গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়।’