একই সঙ্গে ফেরিঘাটের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। দুই দফায় সংশোধনের পর টাকার অংক ও মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুনে ১৪৫ কোটি টাকার এ প্রকল্প শেষ হয়। তবে শেষ মুহূর্তে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটটি ফেরি চলাচলের উপযোগী নয় বলে প্রতিবেদন দেয় বিআইডব্লিউটিএ গঠিত একটি কারিগরি কমিটি। এ কারণে বারবার উদ্যোগ নিয়েও এ রুটে ফেরি চালু করতে পারেনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। অবশেষে ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত নৌপথে পরীক্ষামূলক লঞ্চ সার্ভিসও চালু করা হয়। অবশ্য নদীতে নাব্য সংকটের কারণে তাও বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌরুটে পরীক্ষামূলক লঞ্চ সার্ভিস চালুর ফলে আশার আলো দেখেন ওই অঞ্চলের মানুষ। নৌ-রুট সচল রাখতে উভয় পাশে দুটি টার্মিনালও নির্মাণ করা হয়। রংপুর বিভাগের আট জেলার সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করতে নির্মাণ করা হয়েছিল টার্মিনাল দুটি। তবে সেটি কোনো কাজে আসছে না।
বালাসীঘাটের হোটেল ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার যে লক্ষ্যে টার্মিনাল নির্মাণ করেছে তা পূরণ হয়নি। যদি সেখানে বিনোদনের জন্য পার্ক বা পিকনিক স্পট করা হয় তাহলে বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে আসবে। এতে এ এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে তিস্তামুখ ঘাট-বাহাদুরাবাদ নৌ-রুট চালু করে। এপারে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ ঘাট এবং ওপারে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট। তখন থেকে এ রুটের মাধ্যমে ঢাকা-দিনাজপুর রেল যোগাযোগ চালু ছিল। উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার মানুষ ট্রেনে করে তিস্তামুখ ঘাটে যেত। এরপর তিস্তামুখ ঘাট-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি পারাপার হতো। ওপারে বাহাদুরাবাদ গিয়ে ট্রেনে উঠে ঢাকায় যেত। সে সময় কম খরচে নিরাপদে ঢাকায় যাতায়াত করা যেত।
১৯৯০ সালে নদীর নাব্য সংকটের কারণে তিস্তামুখ ঘাটটি একই উপজেলার বালাসীতে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৬ সালে যমুনা নদীতে নাব্যতা হ্রাসের কারণে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়। ১৯৯৮ সালের জুনে যমুনা বহুমুখী সেতু চালু হয়। ফলে ২০০০ সাল থেকে এ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অকার্যকর হয়ে পড়ে বালাসীঘাট। তখন থেকে প্রায় ২২ বছর বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বালাসী ও বাহাদুরাবাদ নৌ-রুট খনন ও ফেরিঘাটের অবকাঠামো নির্মাণে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ২০১৭ সালে নেয়া প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। পরে দুই দফায় ব্যয় বাড়িয়ে ১৪৫ কোটি ২৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। টার্মিনাল দুটির কাজ শেষ হওয়ার পর নাব্য সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে ২৬ কিলোমিটার দূরত্বের নৌপথ ফেরি চলাচলের অনুপযোগী বলে ঘোষণা দেয় বিআইডব্লিউটিএ। এ প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে খনন করা নৌ-রুট দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েক দফা ফেরি চালানোর চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। পরে নৌ-রুটের সমস্যা খুঁজতে কমিটি গঠন করে বিআইডব্লিউটিএ। তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় কমিটি। তাতে বলা হয়, ভৌতকাজের গুণগত মান ও কাজের তদারকির অভাব, নাব্য সংকট-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতাসহ নানা কারণে নৌ-রুটটি ফেরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে নদীর মরফোলজিক্যাল অবস্থা না জেনেই নির্মাণ করায় বালাসী ও বাহাদুরাবাদের দুই প্রান্তের ফেরিঘাট স্থানান্তর করতে বলা হয়। সেই সঙ্গে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামো ভিন্ন কাজে ব্যবহারের সুপারিশও করে ওই কমিটি।
সার্বিক বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটের বিষয়ে কিছুদিন আগে আমাদের একটা উচ্চপর্যায়ের কমিটি হয়েছে। বালাসীঘাট টার্মিনালে ড্রেজিং অফিস করা হবে। আর বাহাদুরাবাদ ঘাটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করার পরিকল্পনা হয়েছে। তবে এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি।’