দেশে প্রতি বছর গড়ে দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না প্রায় ৫৬ শতাংশ জমি। ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন ও বর্গাচাষী। যাদের হাতে বেশি জমি তারা কৃষিকাজ করেন না। একদিকে বাড়ছে কৃষির উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে ফসলের উপযুক্ত দাম পান না চাষী। কৃষি উপকরণ ও খাদ্য আমদানিনির্ভরতাও রয়েছে। এছাড়া ভূমির অব্যবস্থাপনা ও ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়েই যুগ যুগ ধরে চলছে দেশের কৃষি খাত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো কৃষি ও কৃষককে নিয়ে নানা আশ্বাস দিচ্ছেন। যদিও এখনো নির্বাচনী ইশতাহার ঘোষণা করেনি বেশির ভাগ দল। তবে তাদের বক্তব্যে যেসব প্রতিশ্রুতির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে কৃষকের সব মৌলিক সমস্যা উঠে আসেনি বলেই মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতিতে কৃষির মৌলিক সমস্যাগুলো খুবই কম উঠে আসছে। কম মানে, খুবই কম।’ ইশতাহারে কৃষি খাতের জন্য জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০ শতাংশ বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘কৃষি উপকরণে আমরা আমদানির ওপর নির্ভর করছি। সেচযন্ত্র, বীজ, সার, কীটনাশক, ট্রাক্টর প্রভৃতি আমদানি করে থাকি। এগুলো বাংলাদেশে কীভাবে তৈরি করতে পারি, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে এগুলো থাকা উচিত। কৃষি উপকরণের জোগান বাড়ানো ও মূল্য কমানো, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। কৃষিপণ্য বিপণনে সরকারি হস্তক্ষেপ থাকতে হবে। একদিকে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, অন্যদিকে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিষ্কার ম্যান্ডেট থাকতে হবে। সেজন্য জনসম্মুখে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া উচিত।’
বিএনপির প্রচারণার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড। তারা ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের ‘কৃষি কার্ড’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কৃষি কার্ডের বিষয়ে বিএনপির অফিশিয়াল ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এতে বলা হয়, এটি হবে কৃষকের অধিকার নিশ্চিতের একটি সেবা। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার, কীটনাশক ও বীজ পাবেন। কম খরচে কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তাও পাবেন। কৃষকের জন্য সেচ ব্যবস্থা হবে সহজ ও কম খরচে। সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা কৃষক সরাসরি হাতে পাবেন। সহজ ঋণ সুবিধা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষিবীমা চালু করার কথা বলছে দলটি।
কৃষি কার্ডের পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি তারেক রহমানের একটি ভিডিও দলীয় ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করে বিএনপি। সেখানে তিনি বলেন, ‘কৃষি কার্ডটা হবে ব্যাংক কার্ডের মতো। কার্ডে একটা চিপ থাকবে। দেশে যত কৃষিজমি আছে আমরা সবগুলোকে একটা সার্ভারে নিয়ে আসব। কোন কৃষক কোথায়, তার নাম কী, তার কতটুকু জমি আছে নাকি সেটা সে লিজ নিয়েছে, লিজ নিক অথবা মালিকানা থাকুক, সেটাতে সে কী কী চাষ করছে, কী ফলন হচ্ছে সেই হিসাবও প্রস্তুত করব। এরপর কৃষকের যেকোনো একটি ফসলের সম্পূর্ণ সাপোর্ট দেয়ার চেষ্টা করব। বীজ, সার ও কীটনাশক এ পুরো সাপোর্টটা তাকে পাঁচ থেকে সাত বছর আমরা দেব। এটি দিতে পারলে কৃষকদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এবং সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।’ এছাড়া সব কৃষিজমিকে ম্যাপিংয়ে নিয়ে আসা এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমে কৃষকদের তথ্য দেয়ার কথাও বলেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চাই। কার্ডের অধীনে একদিকে সেচ, সার, বীজ, কীটনাশকের ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে যাবে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আবহাওয়াভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা, কোল্ড স্টোরেজ এবং সাপ্লাই চেইন বা বাজার ব্যবস্থাকে কীভাবে আরো সুন্দর এবং সহজ করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করা হবে। কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বৈচিত্র্যময় করা হবে। আমরা চাই কৃষির শিল্পায়ন এবং এটিকে রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে। কৃষকদের জন্য সম্ভাব্য সর্বনিম্ন সুদে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা এবং ঋণের ব্যবস্থা করতে চাই। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য। এটি মৎস্যজীবী, পশুপালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও খামারিরাও পাবেন।’
জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশগুলোয় কৃষির প্রসঙ্গ এলেও তাদের বক্তব্যে মূল সমস্যাগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই বলছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। দলটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা, কৃষকের সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কথা বলছে।
শনিবার উত্তরাঞ্চলে নির্বাচনী সমাবেশে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কৃষিকে আর পুরনো ধাঁচে চালানো হবে না। এখানে আধুনিকায়ন করে, আধুনিক লজিস্টিক সরবরাহ করে ন্যায্যমূল্যে তা কৃষকের হাতে তুলে দিয়ে আমরা কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে তুলব।’ তিনি আরো বলেন, ‘কৃষিপণ্য উৎপাদন করার পর বাজারে তার সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। সংরক্ষণের অভাবে অনেক সময় উৎপাদিত ফসল ধ্বংস হয়ে যায়। এসব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ফসলের ন্যায্যমূল্য দেয়া হবে। জামায়াতে ইসলামী ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে।’ ওই সফরে উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন জামায়াতের আমির। এছাড়া জামায়াতের পলিসি সামিটে দলটির আমির কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া, কৃষকদের ক্ষমতায়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কথা বলেন।
কৃষি খাত নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আগামীর পরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতাহারের বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই এ বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে রাজি হননি। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন বলা যাবে না। ইশতাহারে কী থাকছে সেটি ঘোষণা করলে জানতে পারবেন।’
জাতীয় নাগরিক পার্টিও কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। গত বছরের ৪ আগস্ট ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠায় ২৪ দফা ইশতাহার ঘোষণা করে এনসিপি। সেখানে টেকসই কৃষি ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের কথা বলেছে দলটি। তারা বলছে, কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, জলবায়ু-সহনশীল জাতের বীজ, পরিবেশবান্ধব সার এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তার ওপর যথাযথ ভর্তুকি প্রদান করা হবে। বিষমুক্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগ উৎসাহিত করে কৃষিকে রফতানিমুখী ও টেকসই খাতে রূপান্তরের কথা বলছে দলটি। তবে নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে এসব প্রতিশ্রুতি কমই উঠে আসছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষক বাঁচাও আন্দোলনটাকে আমরা সামনে আনছি। আমাদের জাতীয় কৃষক শক্তি নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা কৃষকদের অধিকার নিয়ে কাজ করব। তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য বন্ধ করব। আমরা একটা রূপরেখা দেয়ার পরিকল্পনা করছি কীভাবে এ মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে একটা সিস্টেম উন্নয়ন করা যায়।’
ক্ষমতায় গেলে উৎপাদন-সংরক্ষণ ও বিপণনকে প্রাধান্য দিয়ে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কৃষি খাতে সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে কৃষকের বীজ, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র সরাসরি দায়িত্ব নেবে। পণ্য সংরক্ষণে প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক সংরক্ষণাগার ও কৃষিপণ্য সরবরাহে পৃথক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে জমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ুর অভিঘাতে উৎপাদন কমছে। বিনিয়োগের অভাবে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কৃষির মৌলিক সমস্যাগুলোর বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া উচিত।
গবেষক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আবেদীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দলগুলো এখনো তাদের ইশতাহার দেয়নি। বিএনপি তাদের ৩১ দফাতে কৃষকের উৎপাদন, বিপণন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কথা বলেছে। কিন্তু আমি জানি না ওনারা এটার বিস্তারিত কীভাবে চিন্তা করছেন। অন্যান্য দলের ওভাবে কোনো ভিশন বা প্ল্যান আমি দেখিনি। সবগুলো দলই তাদের বক্তব্যে কৃষি নিয়ে কিছু বললেও এর মূল সমস্যা, ভবিষ্যৎ ও বাস্তবায়ন নিয়ে সুনিশ্চিত কোনো বক্তব্য নেই।’
তরুণদের সম্পৃক্ত করতে না পারলে আগামী ১৫-২০ বছর পর দেশের অর্থনীতি কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়তে পারে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এখন আধুনিক কৃষি তথা স্মার্ট কৃষি বা কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের কথা বলা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও দেশের তরুণদের কাজে লাগানো যেতে পারে। শিক্ষিত তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা বানানোর মতো কতটা পরিকল্পনা আছে তা উঠে আসেনি। নিরাপদ খাদ্য, জৈব কৃষি, মাটি রক্ষা করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বীজের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন।’