স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেও উপেক্ষিত অগ্নিনিরাপত্তা

সাত বছরে ৮৬২ অগ্নিকাণ্ডে ১৫ প্রাণহানি, আহত ২৬

গত সাত বছরে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে ৮৬২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫ জন।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অগ্নিনিরাপত্তা উপেক্ষিত। গত সাত বছরে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে ৮৬২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫ জন। আহত হয়েছে আরো ২৬ জন। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সর্বশেষ সোমবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ ঘটনায় পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালে প্রতিদিনই কিছু রোগী মারা যায়। এ মৃত্যুগুলোও তেমনই। এ সময় হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে ও পদদলিত হয়ে অন্তত ২০ জন আহত হয় বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে ৯০টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৯৬২ টাকা। ওই বছর আগুনের ঘটনায় আহত হয় চারজন এবং মারা যায় পাঁচজন। পরের বছর অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ৯১-এ। ২০২১ সালে আগুনে ১৩ জন আহত হয়। ২০২২ সালে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ওই বছর ১৭৬টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়। অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৫০০ টাকা।

পরের বছর পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে উল্লিখিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় ২৪৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব ঘটনায় একজন আহত হয়। ওই বছর অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৪ হাজার ২৯৫ টাকা। ২০২৪ সালে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা কিছুটা কমে ১২৬-এ নেমে আসে। ওই বছর আগুনে দুজন আহত হয়। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৮৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে আবার অগ্নিকাণ্ড বেড়ে ১৩১টিতে দাঁড়ায়। ওই বছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশের হিসাবে এ বছর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অন্তত ৬৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনের এসব ঘটনায় শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় অগ্নিঝুঁকি অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীর উপস্থিতি থাকে। আবার অনেক রোগী শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় আগুন লাগলে দ্রুত সরিয়ে নেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন, বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার জন্য নিয়মিত মহড়ারও প্রয়োজন রয়েছে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, ‘হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অগ্নিনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক রোগী ও স্বজনের উপস্থিতি থাকায় আগুন লাগলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন, বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা এবং কর্মীদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আইন অনুযায়ী পর্যাপ্তসংখ্যক বহির্গমন পথ রাখতে হবে এবং সব বহির্গমন পথ বাধামুক্ত ও চলাচল উপযোগী রাখতে হবে।’

আরও