ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত একটি বিদেশ ভ্রমণের সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর।

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত একটি বিদেশ ভ্রমণের সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর। এতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ফারুক হোসেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ও উপসহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে চীন ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হয়। আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর কিংবা ছুটি শুরুর তারিখ থেকে সাতদিনের জন্য তারা বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি পান।

সরকারি এ তিন কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পাঁচটি নতুন মোবাইল টয়লেট (ভিআইপি) সরবরাহের বিপরীতে তারা সেগুলো পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন। তাদের এ ভ্রমণকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সব ধরনের ব্যয় বহন করবে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান শ্যাংডং কিউয়ানবাই ইন্টেলিজেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড।

অথচ কোনো ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ পরিহারে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। এ নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়েই ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত সরকারি আদেশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোবাইল টয়লেট, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের যন্ত্রপাতি, ট্রেইলার, চেইন ডোজার, স্ক্র্যাপার ব্রিজ ক্রয় এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ও নকশাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার নামে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন। সরকারি নির্দেশনার ব্যত্যয়ের পাশাপাশি ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে এভাবে বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টিকে অনৈতিক ও স্বার্থগত সংঘাত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডলার সংকট ও সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে রাশ টানা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই নিতান্ত প্রয়োজন না হলে অনুমোদন মিলত না। গত বছরের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বিদেশ সফরসংক্রান্ত বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় চলতি বছরের মার্চেও। এত কিছুর পরও কয়েক মাস ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বেড়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যেমন—আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, আইএলও ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদনও পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অর্থায়নেও বেশকিছু সফরের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থেও প্রশিক্ষণ, স্বশরীরে পরিদর্শন, পারফরম্যান্স টেস্ট ও ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্টের নামে অনেক কর্মকর্তাকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ বিভাগ ও এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের ৩৫ কর্মকর্তা ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণকে নিরুৎসাহিত করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া যাবে না বলেও তখন জানানো হয়। আর সরকারি অর্থে কম প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অবশ্যই পরিহারের কথা উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায়। মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অধীন অধিদপ্তর বা সংস্থাপ্রধানেরা একান্ত অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া একসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণে যাবেন না।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার সই করা বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত সে নির্দেশনায় আরো রয়েছে, কেনাকাটা, প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন বা ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্ট ইত্যাদির ক্ষেত্রে কেবল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ পাঠানোর বিষয় বিবেচনা করা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষণ ছুটিতে যাওয়া পরিহার এবং বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কর্মকর্তার পূর্ববর্তী এক বছরের বিদেশ ভ্রমণের বিস্তারিত সংযুক্ত করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গত ২৩ মার্চ আবারো পরিপত্র জারি করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। মুখ্য সচিব স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে। জরুরি কারণ ছাড়া উপদেষ্টা বা সিনিয়র সচিব বা সচিব, একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিবদের সহযাত্রী হিসেবে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করতে হবে। সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা তাদের স্ত্রী কিংবা স্বামী অথবা সন্তানদের সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন না।

সরকারের এ নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে যদিও গত কয়েক মাসে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার অনেক কর্মকর্তা। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত গত ১২ আগস্ট জারি করা বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত এক আদেশে তিন সরকারি কর্মকর্তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তারা হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম, ঢাকা ওয়াসার দাশেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মমতাজুর রহমান ও ঢাকা ওয়াসার উপসচিব শাহিদা কানিজ।

তাদের ভ্রমণের বিষয়ে আদেশে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের বিদ্যমান পাম্প, মোটর, স্ক্রু পাম্পের স্ট্যাটর ও রোটর, পিএলসি এবং স্ক্যাডা সিস্টেমের স্পেয়ার পার্টস কেনার জন্য এ কর্মকর্তারা স্বশরীরে পরিদর্শন ও পারফরম্যান্স টেস্টের জন্য জার্মানি যাবেন। দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তারা এ বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছেন এবং এ-সংক্রান্ত সব ব্যয় টেক-স্ট্রেইট এনার্জি সার্ভিসেস বহন করবে। ভ্রমণ সময় গত জুনে উল্লেখ করা হলেও এর এ-সংক্রান্ত জিও জারি করা হয়েছে দুই মাস পর গত আগস্টে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এর অধীনস্থ বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের জিও জারি করা হয় ৯ সেপ্টেম্বর। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আবুল হাসান; স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ের সুপারিনটেনডিং প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. গোলাম ইয়াজদানি; এলজিইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুপারিনটেনডিং প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম; এলজিইডির ইমপ্রুভমেন্ট অব পন্ডস, ক্যানাল অ্যাক্রস দ্য কান্ট্রি প্রজেক্টের (আইপিসিপি) প্রকল্প পরিচালক মো. ফজলে হাবিব ও একই প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আল ইমরানকে পাঁচদিনের জন্য জাপান ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তারা অ্যাডভ্যান্সড টেকনোলজি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড আয়োজিত অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ট্রেনিংয়ে অংশ নেবেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে কী বিষয়ের ওপর ট্রেনিংয়ে অংশ নেবেন সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এ পাঁচ সরকারি কর্মকর্তার জাপান ভ্রমণের সব ব্যয় অ্যাডভ্যান্সড টেকনোলজি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড বহন করছে।

নতুন লো-বেড ট্রেইলার সরবরাহের বিপরীতে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ড ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ডিএসসিসির তিন কর্মকর্তা। ১৪ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত একটি জিও জারি করা হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার বিভাগের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান, ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মো. শাহ আলম ভূঁইয়া ও উপসহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামকে ২০ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর কিংবা ছুটির শুরুর তারিখ থেকে সাতদিনের জন্য বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তাদের এ ভ্রমণের সব ব্যয় বহন করবে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেলস অ্যান্ড ট্রাকস এশিয়া।

পাঁচটি চেইন ডোজার কেনার আগে এ-সংক্রান্ত অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ট্রেনিংয়ের জন্য চীন ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ডিএসসিসির তিন কর্মকর্তা। তারা হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সহকারী সচিব মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন, ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোহাম্মদ মাহবুব আলম ও উপসহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) তন্ময় কুমার সাহা। যাত্রা শুরুর তারিখ থেকে আটদিনের জন্য তাদের বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ভ্রমণসংক্রান্ত সব ধরনের ব্যয় বহন করবে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সিনোওয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল (সাংহাই) কোম্পানি লিমিটেড ও এইচটিএমএস।

ক্র্যাপার ব্রিজ সংগ্রহে ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্টের জন্য ফ্রান্স ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন তিন সরকারি কর্মকর্তা। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো মনিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ওয়াসার সুপারিনটেনডিং প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম ও মড সার্কেলের সুপারিনটেনডিং প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আমিনকে সাতদিনের জন্য বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে গত ১২ আগস্ট জারি হওয়া একটি জিওতে। তাদের ভ্রমণের সব ব্যয় বহন করবে দক্ষিণ কোরিয়ার তাইইউং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড।

সরকারি নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে এ বিষয়ে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে এতটুকু বলতে পারি, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিতদের নিয়ম মেনে চলা উচিত।’

শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগ নয়, আরো বেশকিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তারাও ঠিকাদার, সরবরাহকারী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৭ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নাজমুল হামিদ রেজা স্বাক্ষরিত এক জিওতে ১৫ সরকারি কর্মকর্তাকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়। তারা হলেন ইআরডির উপসচিব আইরিন পারভীন, আইএমইডির উপপরিচালক মাহফুজুল আলম মাসুম, পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী প্রধান মো. আজিজুর রহমান, বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নাজমুল হামিদ রেজা, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সৈয়দপুর ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী অমর্ত্য রায়, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. নিজামুল ইসলাম মজুমদার ও সহকারী প্রকৌশলী সালমা নাসরিন, বিপিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওমর ফারুক ও নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ, বিপিডিবির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হাসিব উল্লাহ, আখতার জাহান, ও মো. আর রাফী সরকার, বিপিডিবির সহকারী প্রকৌশলী মারিয়া আক্তার ও মো. আদিল-উজ-জামান। যাত্রা শুরুর তারিখ থেকে ১০ দিনের জন্য অনুমোদন পাওয়া এ কর্মকর্তারা বিপিডিবির সৈয়দপুর ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশার ওপর চীনে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেবেন। তাদের সব ভ্রমণব্যয় বহন করছে চীনের ডংফেং ইলেকট্রিক ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (ডিইসি)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। অতীতে কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতেন। মূলত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থে এসব ভ্রমণ করিয়ে থাকে। ফলে এসব ভ্রমণ অন্যায়, বিধিসম্মত না। কেননা ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের ব্যয়ের নেতিবাচক প্রভাব থাকে। মালপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে নিম্নমানের পণ্য দেয়া, কাজের গুণগত মান কমানোর মাধ্যমে পুষিয়ে নেয়ার ব্যাপার থাকে। আবার কোনো কোম্পানির টাকায় ঘুরে আসার পর ওই কোম্পানির প্রতি একটি দুর্বলতা তৈরি হয়। ওই প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করলেও চুপ করে থাকতে হয়।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনা সবাইকে অনুসরণ করতে হবে। কারণ এটি অমান্য করা চাকরিবিধির পরিপন্থী।’

এদিকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদনকে নিজেদের স্বার্থেও ব্যবহার করছেন অনেক কর্মকর্তা। সরকারের কাছ থেকে ইন্দোনেশিয়ায় প্রশিক্ষণ নেয়ার কথা বলে এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন এনবিআরের আলোচিত সদস্য বেলাল হোসেন চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলমান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের উপসচিব বিভীষণ কান্তি দাস স্বাক্ষরিত ১১ সেপ্টেম্বরের এক আদেশে ইন্দোনেশিয়ায় ডাটা সেন্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিপোর্টিং-সংক্রান্ত এক প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার অনুমোদন পান এনবিআরের সদস্য বেলাল চৌধুরীসহ আরো ১০ কর্মকর্তা। তাদের সব ব্যয় বহন করছে স্টার টেক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।

ভ্রমণ নথি অনুযায়ী, বেলাল হোসেন চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। অথচ তিনি প্রশিক্ষণ নিতে ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার অনুমোদন পেয়েছিলেন। ওই একই জিওতে থাকা এনবিআরের বাকি কর্মকর্তারা অবশ্য শনিবার সকালে সরাসরি ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যান।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ কমাতে নির্দেশনা ছিল। তবে এর ব্যত্যয়ের যেসব ঘটনা ঘটেছে সেটি সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার প্রবণতার বিষয় প্রমাণ করে। ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের অর্থে বিদেশ ভ্রমণ আরো অনৈতিক। ভ্রমণের অর্থায়ন করে তারা কিন্তু সরকারকে দানশীলতা দেখাচ্ছে না, বরং এর বিনিময়ে যে মূল্যটা নির্ধারণ করে সেটাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাজেই ওরা বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ দিচ্ছে, এটায় সরকারের কোনো খরচ হচ্ছে না—এ যুক্তি এখানে গ্রহণযোগ্য হবে না। পৃথিবীর কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের পকেটের টাকা ব্যয় করে না, এটা তাদের প্যাকেজের অংশ।’

সরবরাহকারীদের অর্থ বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টিকে স্বার্থগত সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এতে সরবরাহকরী প্রতিষ্ঠানের প্রতি এক ধরনের বাধ্যবাধকতা ও আনুগত্য সৃষ্টি হয়। অথচ মানসম্মত পণ্য আমরা পাচ্ছি কিনা, উন্নত সেবা আমরা পাচ্ছি কিনা সেটা ভালোভাবে দেখাই কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। সে জায়গায় সরবরাহকারীদের টাকায় বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই অনৈতিক এবং সরকারি নির্দেশনার লঙ্ঘন। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় এটি আরো বেশি বিব্রতকার। কারণ অতীতে উন্নয়নের নামে বিদেশে গিয়ে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। গত বছরের আগস্টের পর সেই অবস্থার পরিবর্তন হবে সেটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এর পরিবর্তন হচ্ছে না, কারণ যারা সুযোগ নিচ্ছে তারা ভাবছে—গত ১৬ বছর আমরা এ সুযোগ পাইনি, এখন আমাদের সময়, আমরা এটা করব। এ প্রবণতা এর বহিঃপ্রকাশ। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা অনৈতিকতার আশ্রয় নিচ্ছে, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করছে এবং বাস্তবে তারা ট্রেনিং বা বিভিন্ন কর্মসূচির নামে প্লেজার ট্রিপ বা সুবিধা নিচ্ছে।’

আরও