প্লট নয়, ফ্ল্যাটেই আবাসন সুবিধা দিতে চায় সিডিএ

চট্টগ্রামে নগরবাসীর আবাসনের সুবিধার্থে বিভিন্ন সময় আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

চট্টগ্রামে নগরবাসীর আবাসনের সুবিধার্থে বিভিন্ন সময় আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। প্রায় ১৩টি আবাসিকের সাড়ে ছয় হাজার প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও বেশির ভাগ প্লটেই নির্মাণ হয়নি ঘরবাড়ি। এসব প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ দেয়ার শুরুতে উৎসাহ দেখালেও সিডিএকে টাকা দিয়ে পরে সেখানে বসবাস করতে পারেননি বেশির ভাগ গ্রাহক। আবাসিক প্রকল্পগুলোয় গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, সড়কসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করায় মুখ থুবড়ে পড়েছে এসব প্রকল্প। তবে পুরনো প্রকল্পসহ নতুন যেসব প্রকল্প নেয়া হবে সেখানে প্লট বরাদ্দ না দিয়ে ভবণ নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রির পরিকল্পনা নিয়েছে সিডিএ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি বরাদ্দ দিলে পরে সেখানে বিভিন্ন কারণে আবাসন ব্যবস্থা শতভাগ করা যাবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। তবে সিডিএ যদি নিজে থেকেই আবাসিক এলাকায় সব সুবিধা নিশ্চিত করে ফ্ল্যাট বিক্রি করে, তাহলে প্রকল্পগুলো নাগরিকদের জন্য বসবাসযোগ্য হয়ে উঠবে। তবে সিডিএ কবে নাগাদ এ ব্যবস্থার মধ্যে যেতে পারবে কিংবা যারা প্লট নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের কীভাবে পুনর্বাসন করা হবে সেটা নিয়ে সিডিএর মতামত জানতে চান গ্রাহক।

সিডিএ কর্মকর্তারা বলছেন, সিডিএ এখন পুরনো আবাসিক প্রকল্পগুলো নিয়েই কাজ শুরু করছে। যেখানে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেগুলোকে কীভাবে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক করা যায়, সেটা নিয়ে এখন পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়নি, সেখানে ফ্ল্যাট তৈরি করে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। আবাসন প্রকল্পগুলোয় প্লট বা ফ্ল্যাট যাই হোক সিডিএ তো ব্যবসাতেই নজর দেবে। এ কারণে নগরবাসীর জন্য যেটা বেশি সুবিধাজনক সেটাকেই লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তাছাড়া যেসব নতুন প্রকল্প নেয়া হবে, সেখানে ফ্ল্যাট সিস্টেমে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে যারা ফ্ল্যাট নেবেন, তারা সব নাগরিক সুবিধাগুলো পাবেন। এজন্য এখন আমরা প্লট বরাদ্দ বাতিল করে ফ্ল্যাট নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি।

এ প্রসঙ্গে সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সময় যারা সিডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা বিভিন্ন সময় আবাসিক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের জন্য। সেখানে প্লট বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও ছিল। সিডিএ যেসব আবাসিক প্রকল্প নিয়েছে, সেটা ব্যবসার জন্য। কিন্তু প্রকল্পগুলো নিয়ে সিডিএ প্লট বরাদ্দ দিলেও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি বেশির ভাগ সময়। এজন্য আবাসিক প্রকল্পগুলো কার্যত আলোর মুখ দেখেনি। পুরনো আবাসন প্রকল্পগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটাকে মূল বিষয় হিসেবে রেখেছি।’

সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আবাসিক প্রকল্পগুলোয় এখন আর প্লট বরাদ্দ না দিয়ে, যদি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে পারি তাহলে সেটা ভালো সিদ্ধান্ত হবে। কেননা প্লট সিডিএ বরাদ্দ দিল, কিন্তু নাগরিক কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলো না, তাহলে সেই প্লট নিয়ে মানুষ বছরের পর বছর ভুগবে। কর্ণফুলী ও অনন্যা আবাসিকে প্লট বরাদ্দ দেয়ার পরও বসবাসযোগ্য করা যায়নি। তাহলে যারা প্লট নিয়েছেন, তারা কীভাবে সুযোগ-সুবিধা ছাড়া সেখানে আবাসনে নজর দেবেন। এ কারণে যেসব আবাসিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে সেগুলোতে প্লটগুলো বরাদ্দ না দিয়ে ফ্ল্যাট নির্মাণ করলে সফলতা আসবে। তবে যে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে বসবাসযোগ্য করা যায়, সেটা নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করছি।’

সিডিএর বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পের তথ্যমতে, প্রায় ১৩টি আবাসিক প্রকল্প নিয়েছে সংস্থাটি। এসব আবাসিকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আবাসিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় প্লট রয়েছে ৩৯১টি, চান্দগাঁও আবাসিকে রয়েছে ৭৫৯টি, চান্দগাঁওয়ে ৮২টি, চন্দ্রিমায় ১৮০টি, কল্পলোকে প্রথম পর্যায়ে ৪২৩ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৩৫৬টি এবং কাতালগঞ্জে প্লট রয়েছে ৫৮টি। এছাড়া ১৯৭৭ সালে কর্নেলহাট সিডিএ আবাসিক এলাকায় নির্মাণ তৈরি করা প্লটের সংখ্যা ১৬৮টি এবং জঙ্গল সলিমপুর আবাসিকে রয়েছে ৯০৪টি। ১৯৯৫ সালে কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পে তৈরি করা প্লটের সংখ্যা ৫১৭টি। ২০০৯ সালে ষোলশহর পুনর্বাসন এলাকায় ৪৮টি, ২০০৭ সালে কল্পলোক আবাসিকে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৩৫৬টি ও অনন্যা আবাসিকে দ্বিতীয় পর্যায়ে তৈরি করা প্লটের সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৮টি।

এর মধ্যে অনন্যা আবাসিক-১ ও ২ প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন হয়নি। সিডিএর জঙ্গল-সলিমপুরের ৯০৪টি প্লট এবং মইজ্জারটেক এলাকার কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্প দুটি প্লট পরিত্যক্ত রয়েছে। কল্পলোক আবাসিকে কিছু ঘরবাড়ি নির্মাণ হলেও নাগরিক সেবা নিশ্চিত না করায় অনেক প্লট খালি পড়ে রয়েছে। বায়েজিদ হাউজিং প্রকল্পেও কাজ করা যায়নি। সদ্য সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান দায়িত্বে থাকার সময় নতুন চারটি আবাসন প্রকল্পের প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বে-পার্ল হাইজিং প্রকল্পের (ফেজ-১, ২) ডিপিপি প্রণয়ন হলেও আপাতত স্থগিত রয়েছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আবাসিক প্রকল্প, হামিদচরের কর্ণফুলী রিভারফন্ট রোড সংলগ্ন আবাসিক প্রকল্প এবং আনোয়ারায় বঙ্গবন্ধু টানেল রোড সংলগ্ন আবাসিক প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও আপাতত স্থগিত রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরনো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি সিডিএর কারণেই। তবে সিডিএ যদি নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করে, সেখানে নাগরিক সুবিধা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তবে ফ্ল্যাট তৈরি করে যদি গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা যায়, তাহলে সেটা ভালো সিদ্ধান্ত হবে।’

আরও