দেশে ধানের পর এখনো সবচেয়ে বেশি কৃষক আখ আবাদ করেন

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বালুয়া গ্রামের আখচাষী ফেরদৌস আলম বেশ কয়েক বছর ধরে আখ চাষ করছেন। মহিমাগঞ্জে রংপুর সুগার মিলে আগে তিনি ফসল বিক্রি করতেন। কিন্তু সেটি বন্ধ থাকায় তা

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বালুয়া গ্রামের আখচাষী ফেরদৌস আলম বেশ কয়েক বছর ধরে আখ চাষ করছেন। মহিমাগঞ্জে রংপুর সুগার মিলে আগে তিনি ফসল বিক্রি করতেন। কিন্তু সেটি বন্ধ থাকায় তা এখন বিক্রি করেন জয়পুরহাট সুগার মিলে। সে আয় দিয়েই চলে ফেরদৌসের সংসার।

দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশই যুক্ত রয়েছে কৃষি খাতে, যার অধিকাংশই ধান চাষাবাদ করেন। তবে প্রধান ফসলের পর এখনো সবচেয়ে বেশি কৃষক আখ চাষে সম্পৃক্ত। চিনিকল থাকায় বেশি আবাদ হয় রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে। যদিও সরকারি চিনিকলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে আখ চাষ আগের চেয়ে কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি মিলগুলো চালু হলে চিনির মজুদ বাড়বে। তখন চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারও ভূমিকা রাখতে পারবে। বাজারে গুটিকয়েক আমদানিকারকের আধিপত্য তখন আর থাকবে না।

আখচাষী ফেরদৌস আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি এবার এক একর জমিতে আখ চাষ করেছি। দাম ভালোই পেয়েছি। তবে এলাকার চিনির মিল বন্ধ থাকায় ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে জয়পুরহাটে। আবার সার, জ্বালানি তেল, কীটনাশকের দাম ও সেচ খরচ বাড়ায় অনেক কৃষক আখ চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন। বিকল্প ফসল হিসেবে মিষ্টি আলু চাষ করছেন তারা। কারণ ফসলটি চাষ করতে জাপানি একটি কোম্পানি এলাকায় বিনামূল্যে সার, জ্বালানি তেল ও কীটনাশক দিচ্ছে। উৎপাদন হওয়ার পর প্রতি মণ আলু তারা ৯২০ টাকায় কিনে নেবে বলেছে।’

কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, ধানের পর এখনো দেশের প্রায় ৫৭ শতাংশ কৃষক আখ চাষ করছেন। আর ৩০ শতাংশের মতো চাষবাস করছেন সবজি, পাট ও ডালজাতীয় ফসল। এর বাইরে আলু উৎপাদন করছেন ২২ শতাংশ ও পেঁয়াজ চাষ করছেন ২৩ শতাংশ কৃষক। মূলত বছরে কয়েকবার ফসল চাষাবাদের হিসাব মাথায় রেখে এ প্রতিবদেন তৈরি করা হয়েছে। এখানে কোনো কোনো কৃষক একের অধিকও ফসল উৎপাদন করেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি চিনিকলগুলো বন্ধ থাকায় কৃষক আখ উৎপাদনে কিছুটা বিমুখ হয়েছেন। তবে মিলগুলো আবারো চালু হলে তারা ফসলটির চাষে ফিরবেন। এ বিষয়ে ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি চিনিকলগুলো উৎপাদনে এলে কৃষক আখ চাষে আবারো উৎসাহিত হবেন। সরকারের চিনি মজুদও বাড়বে। তখন পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে এজন্য নতুন ব্যবস্থাপনার আওতায় উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে হবে।’

জানা যায়, প্রতি হেক্টর জমি থেকে আখ উৎপন্ন হয় ৫২ টনের মতো। গুড় হয় চার টন। প্রতি হেক্টর জমিতে আখ উৎপন্ন ও আখ থেকে গুড় উৎপন্ন করতে খরচ হয় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি উৎপাদনের তথ্যমতে, দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আখ চাষ হয়েছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ২৮৯ একর জমিতে। উৎপাদন হয় ৩০ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬৮ হাজার টন আখ উৎপাদন হয়েছিল রাজশাহী বিভাগে। খুলনা অঞ্চলে উৎপাদন হয় ৪ লাখ ৪ হাজার টন। রংপুরে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ও ময়মনসিংহে ২ লাখ ৯১ হাজার টন উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে সবচেয়ে কম আখ চাষ হয় বরিশাল ও সিলেট বিভাগে।

দেশে গত এক দশকে চিনির দাম বড়েছে প্রায় দেড়শ শতাংশ। সে তুলনায় অবশ্য আখের দাম বাড়েনি। আবার সরকারি চিনিকল বন্ধ থাকায় অনেক আখচাষী পড়েছেন বিপাকে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক মো. হাসিবুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে আখ চাষের সঙ্গে জড়িত। তবে গত বছর রাজশাহী সুগার মিল বন্ধ থাকায় সেবার আর আখ চাষ করেননি। এবার সরকার মিল খোলায় আবারো তিনি আখ চাষ করেন নিজের সাড়ে তিন বিঘা জমিতে। আখ বপন, পরিচর্যাসহ খরচ হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। ফসল উৎপাদন হয়েছে ৯৭৫ মণ, যা রাজশাহী সুগার মিলের পুঠিয়া আখ কেন্দ্রে বিক্রি করেছেন ২ লাখ ২০ হাজার টাকায়।

আখ চাষে উৎপাদন ও বিপণনে কিছু সমস্যার কথাও জানান এ কৃষক। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা পানি ও সার। পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ না থাকলে আখ মোটা ও বড় হয় না। আবার রাজশাহী সুগার মিল থেকে সরকারি প্রণোদনার টিএসপি সার পেতেও বেশ বেগ পেতে হয়। অন্যদিকে আখ চাষে কিছুটা লাভের মুখ দেখা গেলেও কষ্টার্জিত ফসলের দাম হাতের মুঠোয় আসতে সময় লেগে যায় চার-পাঁচ মাস। সরকার এসব সমস্যা সমাধান করলে মাঠ পর্যায়ের কৃষক ও সুগার মিল উভয়েই লাভবান হবে বলে জানান আখচাষী হাসিবুল।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের ছয়টি চিনিকল বন্ধ করে দেয়। সেগুলো হলো কুষ্টিয়া চিনিকল, রংপুরের শ্যামপুর চিনিকল, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল, পঞ্চগড় চিনিকল, পাবনা চিনিকল ও রংপুর চিনিকল। ফলে সরকারি এ চিনিকলগুলোয় প্রায় চার বছর ধরে আখ মাড়াই বন্ধ রয়েছে। সেগুলো আবার পর্যায়ক্রমে চালুর চিন্তাভাবনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের কার্যক্রমও শুরু করে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সচিব মো আনোয়ার কবীর অবশ্য জানান, বন্ধ থাকা সরকারি চিনিকলগুলো চালুর কার্যক্রম নানা কারণে খুব বেশি দূর এগোনো যায়নি। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আখের প্রয়োজনীয় জোগান না পাওয়ায় চিনিকলগুলো চালু রাখা যায়নি। দুই-তিন মাস মাড়াইয়ের জন্য যে পরিমাণ আখ লাগে তা পাওয়া যায় না। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্য পেলে কৃষক আবারো আখ চাষ বাড়াবেন বলে আমাদের প্রত্যশা।’

আখচাষীরা বলছেন, বিভিন্ন সংকট কেটে গেলে এবং উচ্চফলনশীল জাত পেলে হয়তো আবারো আখ চাষে আগ্রহ ফিরে পাবেন তারা। যদিও আখ চাষের কোনো সংকট দেখছেন না বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. কবির উদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘উন্নত জাতের বিএসআরআই আখ ৪৩ ও বিএসআরআই আখ ৪৪-এর ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। তবে চিনিকলের সিস্টেম লস, তাদের পুরনো যন্ত্রপাতিসহ নানা সমস্যার কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের উৎপাদন কম হওয়ার আরো অনেক কারণ রয়েছে।’

এদিকে গত মাসে নাটোরের লালপুরে অবস্থিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে চলতি মৌসুমের আখ মাড়াই কার্যক্রম উদ্বোধন করেছিলেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘চিনি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে চায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এজন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি চিনিকল আবারো চালু করা হবে।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রাজশাহী ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি)

আরও