নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বহুল আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা। এরই মধ্যে এ প্রকল্পে বড় ধরনের কাটছাঁট করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এরপর কিছু সুপারিশ দিয়ে সেটি পুনরায় ইসিতে পাঠানো হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনের দেয়া পর্যবেক্ষণগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ইসিতে রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে গত সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন এখনো প্রকল্পটি ফেরত পায়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল রাকিব হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে কিছু পরামর্শ এসেছে। সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে আমরা সংশোধন করেছি। বুধবার আমি সেসব কাজ শেষ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠিয়েছি। বৃহস্পতিবার হয়তো সেটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।’
রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তাদের হাতে বর্তমানে ৭০-৮০টি আসনে নির্বাচন করার মতো ইভিএম রয়েছে। একদিনে ১৫০ আসনে ভোট করতে হলে আরো প্রায় দুই লাখ ইভিএম প্রয়োজন হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল সোমবার পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্প ফেরত আসেনি বলে জানানো হয়। ফলে পরবর্তী ধাপের কাজে যেতে পারছে না কমিশন। আপাতত প্রস্তাবটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রয়েছে।
এ বিষয়ে ইভিএমের দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান আবদুর রউফ সোমবার সন্ধ্যায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের কাছে ইভিএম প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছিল। আমরা কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়েছি। সেগুলো সংশোধন হয়ে এখনো আসেনি। ফেরত এলে সেটার ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা করব। সন্তোষজনক হলে এরপর প্রকল্প প্রস্তাবটি একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।’
গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুই লাখ ইভিএম মেশিন কেনার জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় নির্বাচন কমিশন। এছাড়া ইভিএম সংরক্ষণে জনবল তৈরি ও প্রশিক্ষণের জন্য এখানে ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেখানে ১ হাজার ৩০০ জনবল চাওয়া হয়। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন থেকে পর্যালোচনা করে জনবল ১৩ জন করার কথা বলা হয়।
এদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্পের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। ১৫ জানুয়ারির পর হলে খুবই কঠিন হবে ইভিএমে ভোট নেয়া। এ বিষয়ে রোববার নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ইভিএম প্রকল্পে ১ হাজার ৩০০ জনবল চেয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র ১৩ জন দেয়ার বিষয়ে মত দেয়া হয়েছে। মাত্র ১৩ জন লোকবল দিয়ে ইভিএমে ভোট পরিচালনা সম্ভব নয়। ইভিএমের প্রকল্পের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। ১৫ জানুয়ারির পর হলে খুবই কঠিন হবে ইভিএমে নেয়া।’
এছাড়া এ প্রকল্পে ইভিএম প্রশিক্ষণ এবং সংরক্ষণ-সংক্রান্ত ব্যয়ও সংকুচিত হয়ে আসবে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে কর্নেল রাকিব হাসান বলেন, ‘লোকবল ১ হাজার ৩০০ চাওয়া হয়েছে ইসির পক্ষ থেকে। সেখানে মাত্র ১৩ জন দেয়া হবে। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে প্রকল্পের ব্যয়ে অনেক বড় একটা অংক কমে যাবে। কারণ এই ১ হাজার ৩০০ মানুষের নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, বেতন-ভাতা সবই কমে যাবে। আরো কিছু বিষয়ে কাটছাঁট করতে বলা হয়েছে।’
ইভিএম প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, আগামী সংসদ নির্বাচনে ৪৫ হাজার ভোটকেন্দ্র থাকবে। এর মধ্যে ইভিএমে ভোট হবে ১৫০টি আসনে। কেন্দ্র থাকবে ২৫ হাজার। প্রতি কেন্দ্রে সাতটি করে ইভিএম থাকবে। ইসি বলছে, গত আগস্টে ইসির সংলাপে ২২টি রাজনৈতিক দল ইভিএম নিয়ে মতামত দিয়েছিল। এর মধ্যে ২৯টির মধ্যে ১৭টি রাজনৈতিক দল কোনো না কোনোভাবে ইভিএমের পক্ষে মত দিয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন বলছে, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রকল্প পাস না হলে বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। ৯ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ মাত্র চার কর্মদিবস আগেও ইসি থেকে প্রকল্প ফেরত পায়নি পরিকল্পনা কমিশন। এরপর ১৫ জানুয়ারির আগে আর কোনো একনেক সভা নেই। ফলে ১৫ জানুয়ারির আগে এ প্রকল্প পাস হওয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।