বিদেশ না গিয়েই ইংল্যান্ড-কানাডার ডিগ্রি, সিআরপিকে ঘিরে সাভারে ফিজিওথেরাপি বাণিজ্য

সাভারের সিআরপিকে ঘিরে এমন পরিস্থিতির জন্য সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতিকে দায়ী করছেন ফিজিওথেরাপিস্টরা। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং নার্স হিসেবে কাজ করতে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের নিবন্ধন বা লাইসেন্স প্রয়োজন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পর্যন্ত। বিদেশেও কখনো যাননি। অথচ ভিজিটিং কার্ডে লেখা, ইংল্যান্ড ও কানাডা থেকে একাধিক উচ্চতর ডিগ্রি রয়েছে। কার্ড দেখলে মনে হতে পারে, দেশে তার মতো উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্ট খুব কমই আছেন। তিনি ফরহাদ হুসাইন। সাভারের সিআরপি এলাকার পাশে ‘ইউনিক রিহ্যাব সলিউশন’ নামে ফিজিওথেরাপি সেন্টার খুলে রোগী দেখছেন তিনি। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদেশী ডিগ্রির পুরোটাই ভুয়া। যেসব প্রশিক্ষণ নেয়ার দাবি করেছেন, তার সবগুলোর সনদও দেখাতে পারেননি। আর যেগুলোর সনদ রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই তিন-সাতদিনের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ। অথচ নিজেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিস্ট পরিচয় দিয়ে খুলে বসেছেন রমরমা ব্যবসা, যেখানে রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বও সামলাচ্ছেন।

শুধু ফরহাদ হুসাইন নন, দেশের অন্যতম বৃহৎ পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজডের (সিআরপি) সাভার কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ফিজিওথেরাপি বাণিজ্য। কোথাও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, কোথাও নেই যোগ্যতাসম্পন্ন ফিজিওথেরাপিস্ট। আবার কোনো কোনো সেন্টারে এখনো পড়াশোনা শেষ না করা ব্যক্তিকেও ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতিতে বছরের পর বছর ধরে সিআরপিকে ঘিরে চলছে এ ফিজিওথেরাপি বাণিজ্য।

সরজমিনে ইউনিক রিহ্যাব সলিউশনের প্রবেশপথেই দেখা যায় ফরহাদ হুসাইনের ছবিসংবলিত সাইনবোর্ড। ভিজিটিং কার্ডে উল্লেখ রয়েছে ইংল্যান্ড থেকে তিনি ‘মেকানিক্যাল ডায়াগনোসিস অ্যান্ড থেরাপি ফর মাসকুলোস্কেলিটাল’, ‘অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট অব ব্যালান্স প্রবলেম’ ও ‘স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশন’ বিষয়ে উচ্চতর যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এছাড়া কানাডা থেকে ‘অ্যাডভান্স ট্রান্সফরমিং’ বিষয়ে ডিগ্রি নেয়ার দাবিও রয়েছে কার্ডে।

তবে এসব দাবির বিষয়ে প্রমাণ চাইলে কোনো সনদ দেখাতে পারেননি ফরহাদ। যেসব প্রশিক্ষণের কথা বলেছেন, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল তিন-সাতদিনের স্বল্পমেয়াদি কোর্স। সব প্রশিক্ষণের সনদও তিনি দেখাতে পারেননি। অথচ এসব যোগ্যতার পরিচয় ব্যবহার করে নিজের সেন্টারে রোগী দেখার পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকাতেও হোম পেশেন্ট দেখেন তিনি।

প্রশ্নের মুখে ফরহাদ হুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভিজিটিং কার্ডে এসব বিষয় যেভাবে লেখা হয়েছে, তা ঠিক হয়নি।’ কার্ডের তথ্য সংশোধন করবেন বলেও জানান তিনি। পরে নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা দিতে তার সেন্টারে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট শাহীনুর ইসলামকে ডেকে আনেন। তবে তিনিও ফরহাদের বিদেশী ডিগ্রির দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বা প্রমাণ দিতে পারেননি।

শাহীনুর ইসলাম জানান, তিনি মাত্র চার মাস ধরে ইউনিক রিহ্যাব সলিউশনে কাজ করছেন। ফলে ফরহাদের ডিগ্রি বা পেশাগত যোগ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানেন না। ভিজিটিং কার্ডে লেখা তথ্য এবং লোকমুখে শোনা কথার ভিত্তিতেই তিনি জেনেছেন, ফরহাদ সিআরপিতে প্রায় ১৪ বছর ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়েছেন।

সিআরপিকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রায় অর্ধশত বেসরকারি ফিজিওথেরাপি সেন্টারের অনেকগুলোর অবস্থাই প্রায় একই। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এসব সেন্টার চললেও কার্যকর তদারকি তেমন দেখা যায়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতাসহ নানা ধরনের রোগী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা নিতে সাভারের সিআরপিতে আসে। তবে সবার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এ চাহিদাকে কেন্দ্র করেই সিআরপির আশপাশে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তিমালিকানাধীন ফিজিওথেরাপি ও থেরাপি সেন্টার। অনুসন্ধানে এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিতে যোগ্যতা, অনুমোদন ও সেবা দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

ফরহাদ হুসাইনের সাবেক কর্মস্থল সিআরপির ফিজিওথেরাপি বিভাগের প্রধান আনোয়ার হোসাইন জানান, এসএসসি পাসের পর ফরহাদ সিআরপিতে ১৮ মাসের একটি কোর্স করেন। এরপর টেকনিশিয়ান পদে যোগ দিয়ে প্রায় ১৪ বছর কাজ করেন। তার পুরো কর্মজীবনই ছিল টেকনিশিয়ান হিসেবে। ফরহাদের বিদেশী ডিগ্রির দাবিগুলোকেও ভুয়া বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘এইচএসসি পাসের পর চার বছর মেয়াদি বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি সম্পন্ন করতে হয়। এরপর এক বছরের ইন্টার্নশিপ শেষ করার পরই একজন ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করতে পারেন। তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীরাও এ পরিচয় ব্যবহার করতে পারেন না। কোনো থেরাপি সেন্টার চালাতে হলে অবশ্যই একজন বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপিস্ট থাকতে হবে। তিনি রোগী দেখে কী ধরনের থেরাপি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করবেন। এরপর ডিপ্লোমা-সম্পন্ন ব্যক্তি সেই নির্দেশনা অনুযায়ী থেরাপি দেবেন। আর টেকনিশিয়ানের কাজ হলো তাকে সহায়তা করা—যেমন রোগীকে বেড থেকে হুইলচেয়ারে নেয়া, আবার বেডে তোলা বা দাঁড়াতে সহায়তা করা।’

সাভারের সিআরপি রোডে প্রবেশ করতেই হাতের বাঁ পাশে একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় নিউ এভারকেয়ার ফিজিওথেরাপি সেন্টার। এ প্রতিষ্ঠানেরও কোনো কাগজপত্র নেই। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, এক শিশুকে থেরাপি দিচ্ছেন রাব্বি শিকদার নামের একজন, যিনি নিজেকে ডিপ্লোমা পাস বলে পরিচয় দেন। সেন্টারে বিএসসি ফিজিওথেরাপিস্টের খোঁজ করলে রাব্বি জানান, তিনি ক্লাসে গেছেন। তার কথাতেই জানা যায়, ওই ব্যক্তি এখনো পড়াশোনা শেষ করেননি। অর্থাৎ যাকে সেন্টারের বিএসসি ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তার ডিগ্রি এখনো সম্পন্নই হয়নি।

রাব্বি শিকদার বলেন, ‘এখানে যে বিএসসি থেরাপিস্ট আছেন, তিনি এখনো পড়াশোনা করছেন। আর আমি রোগী দেখি। আমার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে, এজন্য দেখি, বুঝি। কোনো সমস্যা হয় না। তবে একটি সেন্টার চালাতে একজন বিএসসি ফিজিওথেরাপিস্ট লাগে।’ নিউ এভারকেয়ার ফিজিওথেরাপি সেন্টারের ভেতরে দুই রোগীর স্বজনকে পাওয়া যায়। তারা জানান, দালাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে তারা এসেছেন সেবা নিতে। প্রতারণার বিষয়ে জানা নেই।

রাস্তার অন্য পাশেই শিশু রোগীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মা ফিজিওথেরাপি সেন্টার। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর আগেই শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় হালনাগাদ কাগজপত্রও দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

সেন্টারের ম্যানেজার মিরাজ হোসেন বলেন, ‘আমরা নিজেরাই চলতে পারি না। কীসের কর দেব? নিজেরা চলতে পারলে না কর দেব।’ তবে লাইসেন্স না থাকা ছাড়া সেন্টারের অন্য সবকিছু ঠিক আছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সাভারের সিআরপিকে ঘিরে এমন পরিস্থিতির জন্য সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতিকে দায়ী করছেন ফিজিওথেরাপিস্টরা। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং নার্স হিসেবে কাজ করতে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের নিবন্ধন বা লাইসেন্স প্রয়োজন। কিন্তু ফিজিওথেরাপিস্টদের ক্ষেত্রে চাকরি করা বা রোগী দেখার জন্য একই ধরনের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর নেই। তাদের মতে, বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল কার্যকরভাবে কাজ শুরু করলে ভুয়া ফিজিওথেরাপিস্টদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

সিআরপিতে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্ট হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিল কার্যকর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু নানা বাধার কারণে তা হচ্ছে না। সিআরপির সামনে যে হারে ফিজিওথেরাপি সেন্টার গড়ে উঠছে, সেটাও আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। ওয়ার্ডবয় বা টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করা অনেকে এখন নিজেদের ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কর্তৃত্ব রয়েছে, কিন্তু আমাদের সে ধরনের ক্ষমতা নেই। আবার প্রশাসনের সহযোগিতাও পাওয়া যায় না। ফলে আমরা যারা এ পেশায় আছি, তাদের সম্মানহানি হচ্ছে।’

ভুয়া ফিজিওথেরাপিস্টদের কারণে সিআরপির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে জানিয়ে ফিজিওথেরাপিস্ট কনসালট্যান্ট ফারজানা তাওহিদ বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগী ও স্বজন বুঝতে পারেন না কোনটি সিআরপি আর কোনটি বাইরের বেসরকারি সেন্টার। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকে শুরুতেই এসব সেন্টারে যান। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও উন্নতি না হলে পরে সিআরপিতে আসেন। তখন অনেকের শারীরিক অবস্থা আরো জটিল হয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘এমন অনেক রোগী পাই, যারা বাইরে দুই-তিন মাস চিকিৎসা নিয়েছেন। পরে কোনোভাবে খোঁজ পেয়ে আমাদের এখানে আসেন। যেখানে ১৫ দিনে সুস্থ হওয়ার কথা, সেখানে কেউ কেউ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে এমনটা হতো না।’

আরও