স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে লক্ষ্মীপুর বৃহত্তর নোয়াখালীর অংশ থাকলেও ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর সংসদীয় আসনগুলো নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পর জেলার চার আসনে দলীয় রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দীর্ঘ সময়ে জাতীয় রাজনীতির উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের ভোটারের আচরণেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এ অবস্থায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কৃষি উন্নয়ন, শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নদীভাঙন রোধ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান—এসব বিষয়ই এবার ভোটের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, জেলার চারটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৬ লাখ ৩৭ হাজার ৯৫৬। এর মধ্যে পুরুষ ৮ লাখ ৪৭ হাজার ২৯১ ও নারী ভোটার ৭ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৪ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১১ জন। জেলায় তরুণ ভোটার রয়েছেন ৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৬৩ জন।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, প্রবাসী আয়ের ব্যবহার ও স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ নিয়ে প্রার্থীদের অবস্থান যাচাই করছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ভোটাররা। এলাকাটিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবারের নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। আসনটিতে যোগাযোগ, ড্রেনেজ ও শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।
জেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুর রশিদ নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মুমিন উল্যা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ দুই নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসনটি তৎকালীন নোয়াখালী-৮ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১২টি সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি প্রার্থী পাঁচবার, আওয়ামী লীগ তিনবার, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন একবার, জাতীয় পার্টি (জাপা) একবার, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) একবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ছিলেন। দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। প্রথম দিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নাজমুল হাসান মনোনায়নপত্র জমা দেন। তবে আসনটি ১১ দলীয় জোটকে ছেড়ে দেয়া মনোনায়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন তিনি। সেলিমের বিপরীত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়বেন এনসিপির মো. মাহবুব আলম। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ছোট ভাই। এছাড়া ভোটের মাঠে থাকছেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান মাহমুদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জাকির হোসেন পাটোয়ারী, গণঅধিকার পরিষদের মো. কাউসার আলম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মো. বিল্লাল হোসেন ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মো. আলমগীর হোসাইন।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আসন নামে বেশ পরিচিত। দলীয় কোন্দল এড়াতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি এ আসন থেকে নির্বাচন করেন। এবার দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন আবুল খায়ের ভূঁইয়া। তবে ধানের শীষের এ হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির এসইউএস রুহুল আমিন ভূঁইয়া। তারা ছাড়াও এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলনের হেলাল উদ্দিন, নাগরিক ঐক্যের মোহাম্মদ রেজাউল করিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া, গণঅধিকার পরিষদের আবুল বাসার ও কল্যাণ পার্টির মো. ফরহাদ মিয়া। আপিলে এবি পার্টির মো. কেফায়েত হোসেন প্রার্থিতা ফিরে পেলেও পরে তিনি মনোনায়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন।
ভোটাররা বলছেন, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল ঘিরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত। শিল্প খাতের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক কল্যাণ, নৌ-বন্দর ও সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন—এ আসনের প্রধান নির্বাচনী ইস্যু। বিগত পাঁচ দশকে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের নজির স্থাপন করতে পারেননি কেউ। তবে শিল্প-কারখানার সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সংযোগ বাড়ানো নিয়ে প্রার্থীদের পরিকল্পনার দিকেই নজর সাধারণ ভোটারদের।
দীর্ঘদিন ধরেই জেলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসন। এখানে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতির প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, নগর অবকাঠামো ও সরকারি দপ্তরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সদর আসনকে সবসময়ই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর করে রেখেছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ছাড়া এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা।
লক্ষ্মীপুর চারটির মধ্যে এ আসনটিতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হয়। কারণ দলটির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। এর আগেও ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ আসনে এ্যানির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করীম।
বিএনপি-জামায়াতের হেভিওয়েট এ দুই প্রার্থী ছাড়াও এ আসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলনের মো. ইব্রাহীম, জাতীয় পার্টির একেএম মহিউদ্দিন, এলডিপির মো. সামছুদ্দিন ও এনপিপির সেলিম মাহমুদ।
সবচেয়ে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে। মেঘনা নদীর ভাঙন এ অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বারবার বদলে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে ভূমিহীনতা, বাস্তুচ্যুতি ও পুনর্বাসন ইস্যু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও টেকসই সমাধান না হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাই এবারের নির্বাচন নিয়েও ভিন্ন চিন্তায় উপকূলীয় এ অঞ্চলের বাসিন্দারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব এবার জেএসডি থেকে মাঠে লড়ছে। আসনটি নির্বাচনী জনপ্রিয়তায় ইসলামী আন্দোলনের প্রধান আসন হিসেবে ধরা হয়। ১১ দলীয় জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন আসনটি পাওয়ার কথা ছিল। তবে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচন করায় আসনটি প্রার্থী হয়েছেন দলটির উপদেষ্টা খালেদ সাইফুল্লাহ। এছাড়া দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এআর হাফিজ উল্যা, গণঅধিকার পরিষদের রেদোয়ান উল্যা খান, বাসদের মিলন কৃষ্ণ মণ্ডল, স্বতন্ত্র প্রার্থী শরাফ উদ্দিন আজাদ, আ ন ম মনঞ্জুর মোর্শেদ ও নুরুল হুদা চৌধুরী।
ভোটাররা বলছেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে লক্ষ্মীপুর মূলত কৃষি, প্রবাসী আয় ও শিল্পনির্ভর অঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নদীভাঙন ও নগর পরিকল্পনার ঘাটতি এ জেলার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে দেয়নি।
এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর বণিক সমিতির সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত নির্বাচনগুলোতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। বিশেষ করে নৌ-বন্দর, রেললাইন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজীকরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রসার ঘটানো জরুরি। তাই এবারের নির্বাচনে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সক্ষমতাই ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।’