একই সঙ্গে ২ শতাংশ শেয়ারধারী হলেই পর্ষদ সদস্য হওয়ার বিষয়টিও অযৌক্তিক। এর বাইরে গিয়ে যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ডের ভিত্তিতেই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়া উচিত।
গতকাল রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত ব্যাংক ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট এক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। ‘রিস্ক কনফারেন্স অন ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ২০২৬’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠান যৌথভাবে আয়োজন করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিফিন ও ডিনেট।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য নতুন ব্যাংকের লাইসেন্সের আবেদন সাহসের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করার প্রস্তুতি রাখতে হবে।’
উদ্বোধনী অধিবেশনে আরো কথা বলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। ‘ট্রান্সফর্মিং টু রিস্ক বেজড সুপারভিশন’ প্রবন্ধে বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্যবসার জন্য। এখন সেখান থেকে বেরিয়ে ব্যাংকে সংজ্ঞায়ন করতে হবে ঝুঁকি দিয়ে। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও আগে সমাধান করতে হবে।’
‘ক্রেডিট রিস্ক অ্যান্ড এনপিএল ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের ডিন ড. সরওয়ার উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাত কখনো পুরোপুরি ব্যাংকনির্ভর হতে পারে না। দেশের আর্থিক খাতের ৮৮ শতাংশই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। এটি কোনো টেকসই মডেল হতে পারে না। আমাদের এর বাইরে গিয়ে অবশ্যই ভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
বিআইবিএমের অধ্যাপক মো. নেহাল আহমেদ উপস্থাপন করেন ‘ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি অ্যান্ড বেসেল ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রবন্ধ। এ সময় তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হতে পরীক্ষা দিতে হয়। এমনকি ব্যাংক ব্যবস্থার হালনাগাদ পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত কিনা, সেটা প্রমাণ করতে প্রতি দুই বছর পর পরই ওই পরীক্ষায় বসা লাগে। আর আমাদের দেশে পর্ষদ সদস্য হওয়ার জন্য কোনো ধরনের একাডেমিক যোগ্যতাই লাগে না।’
এ অধিবেশনে আরেক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসোশ্যাল লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ও ডিনেটের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ড. অনন্য রায়হান। ‘রিস্ক রিলেটের টু ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন’ শীর্ষক ওই প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘আমাদের নীতিগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে গেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে তিন সরকারের তিন রকম সিদ্ধান্ত দেখেছি। ডিজিটাল ব্যাংক অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু আমরা সে ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত কিনা, তা দেখতে হবে। এর মাধ্যমে যেন স্ক্যামের আরেকটা পথ তৈরি না করি আমরা।’
সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ‘ইভলভিং ব্যাংকিং রিস্কস ইন ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স অ্যান্ড মিটিগেশন’ শিরোনামে। প্যানেল আলোচনার এ অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, ‘জনগণের অর্থ দিয়ে পরিচালিত হয় ব্যাংক। সেজন্য আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় ব্যাংকের স্বাধীনতা জরুরি। তবে উদীয়মান ঝুঁকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এছাড়া ডিজিটাল আর্থিক দুর্বলতা ও সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়গুলোও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’
ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালকের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয় বলে মনে করেন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, ‘একই সামাজিক-শিক্ষাগত পটভূমি থেকে আসা মানুষ শুধু “ইনডিপেনডেন্ট” ট্যাগ পেলেই বদলে যাবে, এটা ভাবা ঠিক না। বিদেশে স্বতন্ত্র পরিচালকরা অত্যন্ত যোগ্য, বিশেষায়িত এবং উচ্চমানের পেশাদার হন। আমাদের এখানে যদি যোগ্যতার মানদণ্ড ঠিক না করা হয়, তাহলে শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ হবে না। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের এখানে স্বতন্ত্র পরিচালকরা বিভিন্ন জনের সিভি দিতেই ব্যস্ত থাকেন। তারা নিজেদের সুবিধা ও বোর্ডকে খুশি করার জন্যই ব্যস্ত থাকেন। এ যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে কোনো কাজ হবে না, বরং ব্যাংক খাতে একই সার্কাস চলতে থাকবে।’
ব্যাংকের ২ শতাংশ শেয়ারধারী হলেই পরিচালক পদে আসার বিষয়টি তুলে দেয়া উচিত বলে মনে করেন এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশে স্বতন্ত্র পরিচালকের ধরন বোঝা আমাদের জন্য জরুরি। জাপান বা আমেরিকার বড় ব্যাংকগুলোতে বড় করপোরেট গ্রুপগুলো শেয়ারহোল্ডার। ওই গ্রুপগুলো থেকে বোর্ডে যাকে পাঠানো হয়, তিনি সাধারণত সেই গ্রুপের সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি, যিনি কার্যত স্বতন্ত্র পরিচালকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটা ভিন্ন। এখানে যে কেউ ২ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনতে পারলে বোর্ডে বসতে পারেন। তার যোগ্যতা, অতীত রেকর্ড বা পারফরম্যান্স যা-ই হোক না কেন। এখানে সাধারণত নিজের পরিচিত বা সংশ্লিষ্ট কাউকে এ পদে বসানো হয়, যিনি পরবর্তী মেয়াদে পদ নবায়ন হবে কিনা—এ চিন্তায় থাকেন। এভাবে “নিরপেক্ষ” পরিচালক দিলে স্বতন্ত্র পরিচালকের ধারণাটাই অকার্যকর হয়ে যাবে।’
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সর্বোচ্চ বোনাস ১৫ লাখ টাকার সীমা উঠিয়ে দেয়ার দাবি করেছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একটি সার্কুলারে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ক্যাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা যৌক্তিক না। আগে অনেক ব্যাংকে ৪০-৫০ লাখ টাকার বোনাসও দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে যারা ভালো পারফর্ম করেছে। এখন যদি কোনো ব্যাংকের পারফরম্যান্স ভালো হয়, তাহলে তাদের কর্মীদের প্রণোদনা দেয়ার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমান নিয়মে দেখা যাচ্ছে—চলতি মুনাফায় কিছু পার্থক্য থাকলেই কর্মীদের বোনাস দেয়া যাচ্ছে না। এটি একটি নেতিবাচক বিষয়। এর ফলে কোনো ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হলে সেখানে দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’
এ অধিবেশনে আরো বক্তব্য রাখেন আইপিডিসি পিএলসির এমডি রিজওয়ান দাউদ সামস। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে হয়তো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান খারাপ, কিন্তু অধিকাংশই ভালো। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার উল্টো। ৩৫টির মধ্যে পাঁচ-ছয়টি ভালো, বাকি সবই খারাপ। এর প্রভাব পড়ছে পুরো খাতে।’
সবশেষ ‘ব্যাংকিং রিস্ক ইন দ্য কনটেক্সট অব গ্লোবাল ওয়ার অ্যান্ড জিও পলিটিক্যাল সিনারিও’ শিরোনামে আরেকটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী।