মেহেরপুরে কলাখেতে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে ছত্রাকজনিত পানামা ও সিগাটোগা রোগ। ফলে এ রোগের আক্রমণে খেতেই মরে যাচ্ছে কলাগাছ। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলার কলাচাষীরা। দ্রুত রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলে জেলায় কলা চাষ হুমকিতে পড়বে বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার গাংনী, মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলায় ১ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে কলা আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে ২১০ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ বেড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকা ও বিক্রি সুবিধার কারণে দিন দিন এ জেলায় কলা চাষ বাড়ছে। জেলায় সাধারণত মেহেরসাগর, বাইশছড়ি, চাঁপাকলা, সবরি ও বিচিকলা জাতের কলার আবাদ হয়। এর মধ্যে বাইশছড়ি ও সবরি জাতের কলার আবাদ বেশি হয়। সব মৌসুমে কলা চাষ এবং তুলনামূলকভাবে ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় সব সময়ে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
কৃষি কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীরা জানান, পানামা ও সিগাটোগা মেহেরপুর জেলার অনেক কৃষকের কাছে অপরিচিত একটি রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে কলাগাছের পাতা হলুদ হয়। পরে ধীরে ধীরে গাছ নিস্তেজ হয়ে মরে যায়। প্রথমে পর্যায়ে কয়েকটি গাছ আক্রান্ত হলেও কিছুদিনের মধ্যে পুরো বাগানে ছড়িয়ে পড়ে এ রোগ। চলতি মৌসুমে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে রোগটি। কৃষকরা জমিতে চারা রোপণের পর সার-কীটনাশক প্রয়োগ ও বিভিন্নভাবে পরিচর্যা করে কলার উঠতি সময়ে গিয়ে দেখছেন কলার আকার খুবই ছোট। পরে পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে, গাছ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। রোগে আক্রান্ত এসব কলাগাছ কেটে দেখা যায় ভেতর থেকে পচে গেছে। এতে চলতি মৌসুমে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলার কলা চাষীরা।
অনেকেই মারা যাওয়া দেখে রাগে ক্ষোভে বাগানে গিয়ে একের পর এক গাছ কাটছেন। অনেকে কলাগাছ কেটে মসুর আবাদ করেছেন, আবার অনেকে কেটে ফেলার চিন্তা করছেন। মাঠে মাঠে কলা খেতে এমন মড়ক দেখা গেলেও কৃষি বিভাগের লোকজন খোঁজখবর নেন না বলে অনেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের দুল্লভ হোসেন বলেন, ‘কলা লাগানোর পরে কীটনাশক ব্যবহার করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। কলার কাঁদি বের হওয়ার সময় পাতা লাল, হলুদ হয়ে যাচ্ছে। পাতা লাল বা হলুদ হতে হতে গাছে যে কাঁদি বের হচ্ছে তাও ঝরে পড়ছে। অনেক গাছ আমি কেটে ফেলেছি। শুধু আমার না অনেকেরই একই অবস্থা। মাঠকে মাঠ রোগ লেগেছে, কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না আমরা। কৃষি অফিস থেকে কোনো লোক যে আসবে আমাদের পরামর্শ দেবে সে রকম কোনো লোক আমরা পাচ্ছি না। আমাদের নিজেদের জ্ঞানে যেটা বলছে সেটাই ব্যবহার করছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এতে আমরা অনেক লোকসানের মুখে পড়েছি।’
কলাচাষী তুষার বলেন, ‘জমিতে কলা লাগানোর পর, সার-বিষ ও শ্রমিক বাবদ অনেক টাকা খরচ করেছি। শেষে কলার কাঁদি আসার সময় সব গাছ মরে যাচ্ছে। এখন ভাবছি, কলা তুলে দেব নাকি অন্য কোনো আবাদে যাব।’
কৃষক হোসেন আলী বলেন, ‘আমার তিন বিঘা জমিতে কলা ছিল। বিঘাপ্রতি প্রায় ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ করে দেখি কলাগাছ প্রায় সবই মরে গেছে। তাই অর্ধেক জমিতে মসুর আবাদ করেছি। আর যে অর্ধেক জমিতে কলাগাছ আছে, সেখানে শিকড় থেকে গাছ পচে যাচ্ছে। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, কীটনাশক আর সারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েও কাজ হয়নি। আর কৃষি অফিসাররা তো মাঠে আসেন না।’
মেহেরপুর সদর উপজেলার আশরাফপুর গ্রামের কৃষক দাউদ হোসেন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে সবরি কলা চাষীদের ব্যাপক লোকসান হচ্ছে। সব কলাগাছের মাথা ও পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। গাছ চিকন হয়ে যাচ্ছে, কলার কাঁদি ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং ফলও হয়ে যাচ্ছে ছোট। চাষীরা যে টাকায় সার-বিষ দিচ্ছেন তার অর্ধেকও উঠছে না। যার জন্য অনেক চাষী কলাগাছ কেটে ফেলে দিচ্ছেন।’
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ মোহাইমেন আক্তার বলেন, ‘এ উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি আমি। এখনো কোনো রিপোর্ট দেখতে পারিনি। তবে পানামা ও সিগাটোগা রোগ শুরু হয়ে গেলে আমাদের আর কিছু করণীয় থাকে না। একই জমিতে একাধিকবার কলার আবাদ করলে এ রোগের দেখা মেলে। তাছাড়া যারা নতুন চাষী তাদের খেতেই এ রোগ দেখা দিলে আগেই ব্যবস্থা নিতে হতো। এখন আর কিছুই করার নেই। গাংনী উপজেলার ২৮টি ব্লক রয়েছে। তার মধ্যে ১৮ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আছেন। ফলে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। তার পরও কৃষকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে সরাসরি না যেতে পারলেও আমরা সেলফোনে কৃষকদের পরামর্শ নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শংকর কুমার বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করে এবং বিভিন্ন জায়গায় তাদের পাঠিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।’