জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কাজ রাজস্ব সংগ্রহ। সেই সঙ্গে তৈরি করতে হয় নীতিও। রাজস্ব সংগ্রহ ও নীতি তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত উভয় বিভাগের কর্মকর্তারাই এনবিআরের আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের। ফলে ঘুরেফিরে তারাই এ দায়িত্ব পালন করেন। নিজেদের সুবিধামতো নীতি তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে। তাই বিভিন্ন সময় এ দুটি বিভাগকে পৃথক করার দাবি উঠেছে। অফিসের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষও আলাদা করার কথা বলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও একই দাবি উত্থাপন হয়। সে অনুযায়ী এনবিআরের নীতি ও প্রশাসন বিভাগকে পৃথক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে আজ এনবিআর ভবনে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে বিশ্বব্যাংক। এতে এনবিআর চেয়ারম্যান ও সদস্য, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলসহ মনোনীতরা উপস্থিত থাকবেন।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকও চায় এনবিআরের নীতি ও প্রশাসন বিভাগকে আলাদা করা হোক। তাই এ দুটি বিভাগ পৃথক হলে পরবর্তী সময়ে কীভাবে কাজ করা হবে সেমিনারে সে বিষয়ে নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরবে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাও তারা শুনবেন।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বিশ্বে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। এতে দেশটির স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সামর্থ্য সীমিত হয়ে এসেছে। জিডিপিতে এসব খাতে সরকারি ব্যয়ের অংশের দিক থেকেও বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। বিশ্বব্যাংক এখন অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। কর নীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার মতো বিষয়গুলোও এরই অন্তর্ভুক্ত, যা অন্যায্য সুবিধা দেয়া বন্ধের পাশাপাশি রাজস্ব আয়কে কাজে লাগানোর জন্য জরুরি। এটি অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, বৈচিত্র্যায়ণ ও আরো অবাধ বাণিজ্যের সহায়ক হবে। উপরন্তু এসব সংস্কার করনীতি প্রণয়ন, কমপ্লায়েন্স ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে। সংস্কারের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।’
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ২০০৪ সাল থেকেই এনবিআরের নীতি ও প্রশাসনকে পৃথকের প্রস্তাব করে আসছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। অন্তর্বর্তী সরকারের এ সময়ে সেটি আরো জোরালো হয়েছে। আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারদের অ্যাসোসিয়েশন এরই মধ্যে তাদের প্রস্তাবও তৈরি করেছে। তাদের দাবি, নীতি ও প্রশাসনে দুজন আলাদা সচিব থাকবেন। উভয় দপ্তরপ্রধান সরাসরি অর্থমন্ত্রীকে রিপোর্ট করবেন। অর্থাৎ কেউ কারো ওপর নির্ভরশীল হবেন না। তবে তারাও আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডার থেকে নিয়োগ পাবেন। নীতি ও প্রশাসনের সব কর্মকর্তাও আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডার থেকেই নিতে হবে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলেন, রাজস্ব আয়ের চিন্তা মাথায় থাকলে ভালো নীতি তৈরি করা যায় না। কর আহরণের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে সমতা নিশ্চিত ও কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে যাওয়া। আমরা চাই, প্রশাসন ও নীতি আলাদা হলেও আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তারাই কাজ করবেন। নীতি বিভাগে অবশ্যই গবেষক, পরিসংখ্যানবিদ, অর্থনীতিবিদ, আইনবিদ, অ্যানালিস্ট ও বিশেষজ্ঞরা থাকতে হবে। এছাড়া থাকতে হবে করদাতা তথা ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিও। তবে নন-টেকনিক্যাল কেউ যেন নীতি বিভাগে কাজ না করেন।
অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) হয়ে যাবে পলিসি অর্থাৎ নীতি বিভাগ। তারা শুধু নীতি তৈরি করবেন। তাদের একজন সচিব থাকবেন। আর রাজস্ব সংগ্রহ বা বাস্তবায়ন থাকবে এনবিআরের কাছে। এখানে সচিব পদমর্যাদায় এনবিআর চেয়ারম্যান শুধু রাজস্ব সংগ্রহ তদারক করবেন।
নীতি ও প্রশাসনকে আলাদা করতে ২০০৮ সালেই একটি আদেশ হয়েছিল। বলা হয়েছিল নীতিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা আইআরডিতে বসবেন। তখন জায়গা না থাকায় সেখানে যাওয়া হয়নি বলে জানান এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পলিসি আলাদা হওয়া উচিত। অফিসও আলাদা হবে। এতে স্বচ্ছতা আসবে। রাজস্ব আহরণে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে এনবিআর। করদাতাদের সেবায় সময় বেশি দিতে পারবে। তবে টেকনিক্যাল কাজ নন-টেকনিক্যাল লোক দিয়ে করানো যাবে না। নন-টেকনিক্যাল লোক দিয়ে করালে পরিস্থিতি বরং আরো খারাপ হবে।’
এনবিআরের আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, নীতি শাখা প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত নয়, তারা শুধু নীতিগত কাজ করে। আলাদা হয়ে গেলেও কাজগুলো এনবিআরের লোকজনকেই করতে হবে। আর ক্রেডিট তখন অন্য কারো কাছে যাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে আয়কর ক্যাডারের এক সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলাদা হলে যদি রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে, তাহলে তো ভালো। নয়তো আলাদা করে কী ফায়দা! জেনারেল ক্যাডারের জনবল দিয়ে হাই টেকনিক্যাল সার্ভিস সামলানো মুশকিল। অধীন-পরাধীন হলে তো সমস্যা। বাইরে থেকে লোক এনে কাজ করালে কাজের পরিবেশ আরো বিঘ্নিত করবে। তাই এ বিষয়ে আরো পর্যালোচনা দরকার। আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কিনা সেটিও ভাবতে হবে। ভারত, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার আমলাতন্ত্র আর আমাদের আমলাতন্ত্র তো এক নয়।’
এনবিআরের নীতি ও প্রশাসন বিভাগকে পৃথক করার বিষয়েও কেউ কেউ মত দিয়েছেন। সংস্থাটির কাস্টমস ক্যাডারের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পলিসি করার সময় যদি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার বিষয় মাথায় থাকে তবে এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে এ দুটো বিষয় আলাদা হওয়াই ভালো। তবে এসব বিষয়ে প্রশাসন ক্যাডারের নাক গলানো মারাত্মক ক্ষতিকর! তাই উভয় অংশই বিশেষায়িত এ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দিয়েই পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। এর জন্য ভারত বা অন্য কিছু দেশের আদলে আলাদা রাজস্ব পলিসি ও রাজস্ব প্রশাসন বিভাগ থাকা উচিত।’
ব্যবসায়ীরাও বিভিন্ন সময় এনবিআরের নীতি ও প্রশাসন বিভাগকে পৃথক করার দাবি জানিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সম্প্রতি এক সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাজস্ব আদায়কারী ও আইনপ্রণেতা আলাদা করা হবে।’
সাবির্ক বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি নিজেও অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করি।’