গণপরিবহনে অগ্রিম কর বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, চাপ পড়বে যাত্রীসেবায়

বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত ৫২টির বেশি আসনবিশিষ্ট বাস সারা বছর যত আয়ই করুক ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে বছরে একবার ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে।

বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত ৫২টির বেশি আসনবিশিষ্ট বাস সারা বছর যত আয়ই করুক ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে বছরে একবার ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে। এ ধরনের যানবাহনের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছর দিতে হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা। ৫২টির অধিক আসন নয় এমন বাসের ক্ষেত্রে দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। চলতি অর্থবছরে দিতে হচ্ছে সাড়ে ১১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে এ করহার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এতে যাত্রীর ওপর খরচের চাপ পড়তে পারে। যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রীর নিরাপত্তায় বরাদ্দ না বাড়িয়ে কেবল করহার বাড়ানো কাম্য হতে পারে না। তবে এনবিআরের দাবি যাত্রীর ওপর চাপ পড়বে না।

অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের জন্য দিতে হবে ৫০ হাজার, ডাবল ডেকার বাস ২৫ হাজার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিনিবাস বা কোস্টার ২৫ হাজার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় এমন মিনিবাস বা কোস্টার ১২ হাজার ৫০০, প্রাইম মুভার ৩৫ হাজার, পাঁচ টনের অধিক পেলোড ক্যাপাসিটি বিশিষ্ট ট্রাক, লরি বা ট্যাংক লরি ৩০ হাজার; দেড় টনের অধিক তবে পাঁচ টনের অধিক নয় এমন পেলোড ক্যাপাসিটি বিশিষ্ট ট্রাক, লরি বা ট্যাংক-লরি ১৫ হাজার, দেড় টনের অধিক নয় এমন পেলোড ক্যাপাসিটি বিশিষ্ট ট্রাক, লরি বা ট্যাংক লরি ৭ হাজার ৫০০, পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার, ম্যাক্সি বা অটোরিকশা ৭ হাজার ৫০০, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সিক্যাব ১৫ হাজার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় এমন ট্যাক্সিক্যাব ৭ হাজার ৫০০ টাকা।

এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) একেএম বদিউল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ কর বছরে একবার দিতে হয়। মোটরযান নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নের সময় প্রতিটি যানবাহনের ক্ষেত্রে এ কর আদায়ের চালান যাচাই করা হয়।’

পরিবহন খাতে অগ্রিম আয়কর বাড়ানো হলেও আমদানির ক্ষেত্রে এবারের বাজেটে ১০-১৫ আসনের মাইক্রোবাসে সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) বা সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং ১৬-৪০ আসনের যাত্রীবাহী বাসের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি (সিডি) বা আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকা-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর রুটের ইকোনো সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) রবিন মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সব গাড়ি ৪০ আসনের। এখন প্রতি গাড়িতে ১১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া সবকিছুরই দাম বেড়ে গেছে। আগামী অর্থবছরে বাড়তি করের চাপও বাড়বে। সেটার কিছু প্রভাব তো যাত্রীদের ওপর পড়বেই। বিআরটিএ ভাড়া নির্ধারণ করে তেলের দামের ওপর। ভাড়া নির্ধারণের সময় অন্য সবকিছু হিসাব করলে আমাদের উপকার হতো।’

সাবেক কর কমিশনার ও জনতা পার্টি বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মো. আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় যেসব বাস চলে, মালিকরা অনেকে চালাতেই পারছেন না। বিনিয়োগের তুলনায় তাদের আয় লাভজনক নয়। এ পরিমাণ টাকা অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে বেশি লাভ করতেন। এ করহার আরো কমানো দরকার। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলোর পথ খরচ অনেক। ছয় মাস অন্তর চাকা ও টায়ার পরিবর্তন করতে হয়। জ্বালানি খরচ বেড়েছে। কর বাড়লেও বাস মালিকরা চাইলেই ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। এখানে সরকারের বিষয় রয়েছে।’

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীদের করের বোঝা নাও বাড়তে পারে, যদি তাদের প্রকৃত করের পরিমাণ এ ধারার অধীনে সংগৃহীত করের চেয়ে বেশি হয়। যদি তাদের প্রকৃত করের পরিমাণ সংগৃহীত করের চেয়ে কম হয়, তাহলে তাদের করের বোঝা বাড়তে পারে। কারণ এটি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একটি ন্যূনতম কর। যদি করের বোঝা বাড়ে, তাহলে এ অতিরিক্ত খরচ যাত্রীদের ওপর চাপানো হতে পারে।’

অর্থ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, যদি মোটরযানটি সরকার, সরকার বা স্থানীয় সরকারের অধীন কোনো প্রকল্প, কর্মসূচি বা কার্যক্রম; কোনো বৈদেশিক কূটনীতিক, বাংলাদেশে কোনো কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘ ও তার অঙ্গসংগঠনের দপ্তরগুলো; বাংলাদেশের কোনো বিদেশী উন্নয়ন অংশীজন এবং তার সংযুক্ত দপ্তর বা দপ্তরগুলো; ধারা ১৬৬-এর উপধারা (২) অনুসারে রিটার্ন দাখিল থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত করদাতারা, অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হবে না মর্মে বোর্ড থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণকারী কোনো প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর সংগ্রহ করা যাবে না।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করহার বাড়ানো নিয়ে আপত্তি নেই। আমাদের আপত্তির জায়গা হলো ভাঙাচোরা সড়ক, বিধ্বস্ত ব্রিজ, কালভার্ট, সেতু, অনিরাপদ সড়ক। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা করে দিয়ে কর বাড়ালে কোনো আপত্তি নেই। বাংলাদেশে স্টার মানের কোনো সড়ক নেই, অথচ করহার উচ্চ। মোটরযান নিবন্ধনে সরকার যে হারে কর নেয়, সে হারে সড়কের নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ দেয় না। সড়ক নির্মাণ ও মেরামতে নজর না দিয়ে কেবল জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না।’

এ অগ্রিম কর বাড়ায় যাত্রীদের ওপর চাপ পড়বে বলে মনে করেন এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি নামে আয়কর হলেও আদায় পদ্ধতি পরোক্ষ কর প্রকৃতির। মূলত বাস মালিকরা এটি যাত্রীদের থেকেই আদায় করবেন। কাজেই এতে অবশ্যই যাত্রীদের ব্যয় বাড়বে।’

সারা বছর যত আয়ই করুক, নির্ধারিত এ কর দিতে হবে। এটা কি যৌক্তিক হয়েছে? এতে আয় অপ্রদর্শিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে কিনা জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা অগ্রিম আয়কর, চূড়ান্ত কর নয়। আয় বেশি হলে অবশ্যই অতিরিক্ত আয়কর দিতে হবে।’

এতে যাত্রী ভাড়া বেড়ে যাবে কিনা জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি আয়ের ওপর প্রদেয় অগ্রিম আয়কর। পরোক্ষ কর বা আমদানি শুল্কের মতো খরচ বিবেচনা করে ভাড়া বাড়ানোর কথা না।’

আরও