সংরক্ষিত বন : সংকট ও সম্ভাবনা

জেগে উঠছে আলতা দিঘি, আগের রূপে ফিরতে লাগবে কয়েক দশক

শীতে দিঘির জলে ডানা ঝাপটাত, খুনসুটিতে মেতে উঠত নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি।

চারদিকে সবুজ বৃক্ষের বেষ্টনী। মাঝখানে ১ হাজার ১০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫০০ মিটার প্রস্থের একটি দিঘি। শীতে দিঘির জলে ডানা ঝাপটাত, খুনসুটিতে মেতে উঠত নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। দিঘির টলটলে জলে বড় বড় পাতার মধ্যে ফুটে থাকত সাদা ও গোলাপি পদ্ম। বছর পাঁচেক আগেও এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যেত নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার আলতা দিঘি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অবস্থিত বিশাল দিঘিটিতে।

সংস্কারের জন্য ২০২৪ সালে পাল আমলে সৃষ্ট ঐতিহাসিক দিঘিটির চারপাশের গাছ কেটে ফেলা হয়। এতে আশ্রয়হীন হয়ে এলাকা ছেড়েছে পশুপাখি। দিঘি পুনঃখনন ও চারপাশে কিছু গাছ লাগানোর পর বর্তমানে বর্ষায় আলতা দিঘিতে কিছুটা প্রাণ ফিরছে। চারদিক থেকে ছুটে আসা পাখির কিচিরমিচির শব্দও বেড়েছে। তবে আগের মতো বিশাল জলরাশি, পাখির কিচিরমিচির আর শালবনের সবুজের মেলবন্ধন উপভোগ করতে আরো কয়েক দশক লাগবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশবাদীরা জানান, আলতা দিঘি জাতীয় উদ্যানে প্রায় ৪০০ একর আয়তনের একটি প্রাকৃতিক শালবন রয়েছে। সরকার ওই এলাকার গুরুত্ব অনুধাবন করে এলাকাটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে। অথচ সেই বনভূমির মধ্যে আলতা দিঘি পুনঃখননসহ বন ধ্বংসকারী বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দিঘিটি পুনঃখননের নামে তিন হাজারের বেশি গাছ কেটে ফেলায় প্রচুর পশুপাখি আশ্রয়হীন হয়ে এলাকা ছেড়েছে। এছাড়া দিঘি খনন করতে গিয়ে পদ্মগাছসহ প্রচুর জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কয়েক দশক লেগে যাবে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আলতা দিঘি পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দিঘির চারপাশের ১ হাজার ১০২টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুনঃখননের জন্য দিঘিটি শুকিয়ে ফেলায় ধ্বংস হয়েছে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। এর পর থেকে ৪৩ একর আয়তনের দিঘিটি বর্ষা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই শুকনো থাকে। ফলে উদ্যানের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এছাড়া নতুন করে রোপণ করা গাছগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যান এলাকায় গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণে অনেক চারা গাছ নষ্ট হচ্ছে। দিঘির পশ্চিমাংশ এখন অনেকটা গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে নওগাঁর ধামইরহাটে আলতা দিঘি জাতীয় উদ্যানে ঝড়ে উপড়ে যাওয়া তিন শতাধিক শাল, আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছ পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, লোকবল সংকটের কথা বলে এসব গাছ দীর্ঘদিন ফেলে রেখেছে বন বিভাগ। আর সুযোগ বুঝে দুর্বৃত্তরা বনের ভেতর থেকে উপড়ে পড়া এসব গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহী সামাজিক বন বিভাগের আওতাধীন নওগাঁর পাইকবান্দা রেঞ্জের বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম ফরহাদ জাহান বলেন, ‘গত বছর ঝড়ের কারণে বেশকিছু গাছ মাটিতে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর একটি তালিকা করে রাজশাহী বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গাছ চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়।

আলতা দিঘির সমস্যাগুলোর বিষয়ে অবগত রয়েছেন উল্লেখ করে রাজশাহী সামাজিক বন বিভাগের আওতাধীন নওগাঁর পাইকবান্দা রেঞ্জের বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম ফরহাদ জানান, লোকবল সংকটের কারণে অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি জাতীয় উদ্যানের সৌন্দর্য ও সম্পদ রক্ষায় জনসাধারণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান পাইকবান্ধা রেঞ্জের বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা।

আরও