অর্থবছরের প্রথম চার মাস

ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়াল ৪৮ হাজার কোটি টাকায়

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী গতকাল বর্ধিত বেতনসহ অক্টোবরের বেতন-ভাতা পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। বর্ধিত এ বেতনের জোগানসহ পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে গোটা অক্টোবরজুড়েই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছিল সরকার।

ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আয় হচ্ছে না সরকারের। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকায়। এ পরিস্থিতিতে অর্থ সংকটে থাকা সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে। কেবল অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই (জুলাই-অক্টোবর) ব্যাংক খাত থেকে নেয়া সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ৪৮ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি ধরা হয়েছে। এ অর্থ দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জোগান দেয়ার কথা। এর মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই এ লক্ষ্যের প্রায় ৪৩ শতাংশ পূরণ হয়ে গিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত অর্থবছরের মাঝামাঝি ও শেষের দিকে ব্যাংক খাত থেকে সরকার বেশি ঋণ নেয়। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন ও প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় এবার অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকার ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে। এমনকি নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মচারীদের বেতন দিতে গত ২৯ অক্টোবর সরকার ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমেও ব্যাংক খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলেছে। এ কারণে সরকারের নেয়া ঋণের নিট স্থিতিও চলতি অর্থবছরে বেড়ে গিয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। আমরা সে দায়িত্ব পালন করছি। প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় হচ্ছে না। বিপরীতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে।’

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী গতকাল বর্ধিত বেতনসহ অক্টোবরের বেতন-ভাতা পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। বর্ধিত এ বেতনের জোগানসহ পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে গোটা অক্টোবরজুড়েই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছিল সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল গত মাসে ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ তোলা হয়েছে। অতীতে কখনো এক মাসে সরকারকে এত ঋণ নিতে দেখা যায়নি। এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ তুলেছিল সরকার। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫০ ও সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা।

ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলামের মাধ্যমে নেয়া এ ঋণের হিসাব নিট নয়। নতুন নেয়া ঋণের বড় একটি অংশ মেয়াদ পূর্ণ হওয়া আগের বিল-বন্ড পরিশোধ বা রি-ইস্যুতে ব্যয় হয়। সে হিসাবে অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ ৪৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩৪ শতাংশেরও বেশি। যদিও একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বেসরকারি খাতে বিরাজমান ঋণ খরা আরো তীব্র হচ্ছে। বিপরীতে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় ঠেকবে।

আরও