ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল

বাড়ছে রোগীর চাপ, নির্মাণের এক বছরেও চালু হয়নি ৫০০ শয্যার নতুন ভবন

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল।

দেশের স্নায়ুরোগ চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে স্ট্রোক, মস্তিষ্কে আঘাত, মেরুদণ্ডের জটিলতা, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া, মৃগী, গুলেন বারি সিনড্রোম, হাইড্রোসেফালাসসহ নানা জটিল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হাজারো মানুষ চিকিৎসার আশায় এখানে ছুটে আসে। কিন্তু রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপের বিপরীতে সীমিত শয্যা ও জনবল সংকটে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এ পরিস্থিতিতেও চালু হয়নি প্রায় এক বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া ৫০০ শয্যার নতুন ভবন। রোগী ও স্বজনরা বলছেন, নতুন ভবনটি চালু হলে বহু মানুষের দুর্ভোগ কমত। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও জনবল সংকটের কারণে সেটি এখনো রোগীদের জন্য উন্মুক্ত হয়নি বলে জানান দায়িত্বশীলরা।

৩০০ শয্যা নিয়ে ২০১২ সালে যাত্রা করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। পরে আরো ২০০ শয্যা যুক্ত করা হয়। কিন্তু গত এক দশকে দেশে স্নায়ুরোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আরো ৫০০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে তিন-চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এর মধ্যে অন্তত ১২৫-৫০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে সেবা দেয়া জরুরি। কিন্তু বিদ্যমান ৫০০ শয্যার সীমাবদ্ধতায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক রোগীকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেককেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় কিংবা ছুটতে হয় অন্য হাসপাতালে।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে স্ট্রোকে আক্রান্ত ৬২ বছর বয়সী আবদুল মালেককে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন ছেলে মো. হাসান। চিকিৎসক দ্রুত ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেও শয্যা খালি না থাকায় কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। গতকাল হাসপাতাল চত্বরে কথা হলে হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাবার অবস্থা ছিল গুরুতর। দ্রুতই ভর্তি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বেড না থাকায় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। তখন বুঝতে পারছিলাম না কী করব। পরে অনেক চেষ্টা করে ভর্তি করতে হয়েছে।’

এ ধরনের অভিজ্ঞতা এখন হাসপাতালের দৈনন্দিন বাস্তবতা বলে জানান রোগীর স্বজনরা। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসের পরিসংখ্যানেও এ চাপের চিত্র উঠে আসে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৯২৩ জন। ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ৭৭৫ রোগী। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ২০ হাজারের বেশি এবং পাঁচ মাসে সম্পন্ন হয় ১ হাজার ৭০০টির বেশি মেজর সার্জারি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে স্ট্রোক ও অন্যান্য স্নায়ুরোগীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর অন্যতম কারণ এখন স্ট্রোক। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বার্ধক্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে স্নায়ুরোগীর চাপ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএস জহিরুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে স্ট্রোকের রোগী প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এক্ষেত্রে প্রথমেই সচেতনতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, হেলথ কমপ্লেক্সগুলোয় যে চিকিৎসকরা আছেন তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। রেফারেল সিস্টেম চালু করা জরুরি। টার্শিয়ারি লেভেলের যে হাসপাতালগুলো রয়েছে সেগুলোকে আরো উন্নত করাও এখন সময়ের দাবি। কেননা বিএমইউ, ঢাকা মেডিকেল বা নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে যে ধরনের চিকিৎসা দেয়া হয়, তা টার্শিয়ারি লেভেলের হাসপাতালে নেই। সে কারণেই রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বাড়ছে।’

নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে যখন ভয়াবহ রোগীর চাপ, তখন পাশেই পড়ে আছে তাদের ১৫ তলাবিশিষ্ট আরেকটি আধুনিক ভবন। ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০০ শয্যার নতুন এ ভবন গত বছর হস্তান্তর এবং উদ্বোধন হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও বাজেটের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও চিকিৎসা সরঞ্জাম এরই মধ্যে সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে কেবল বেজমেন্টে সীমিত পরিসরে সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও এক্স-রেসেবা চালু রয়েছে। বাকি ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার ও অন্যান্য বিভাগ পড়ে আছে ব্যবহারহীন অবস্থায়। অন্যদিকে পুরনো ৫০০ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ সীমাহীন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, নতুন ভবন চালু হলে রোগীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমত।

হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীরা জানান, নতুন ভবন চালুর জন্য বহুবার চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগের দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে নতুন ভবনের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর বড় অংশই অলস পড়ে রয়েছে।

হাসপাতালের নতুন ইউনিটটিতে আধুনিক ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক ইউনিট, আইসিইউ, এইচডিইউ ও ১০০ শয্যার বিশেষায়িত ট্রমা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের জন্য এ ট্রমা ইউনিট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন ভবন চালু হলে হাসপাতালের মোট শয্যা সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে আইসিইউ ও হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটের সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ত। কিন্তু ভবনটি চালু না হওয়ায় এসব সুবিধা এখনো কাগজেই সীমাবদ্ধ।

বর্তমানে ৫০০ শয্যার বিপরীতে অনুমোদিত নার্সের পদ রয়েছে ৮১৪টি; কর্মরত ৬৩৮ জন। চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৬৫০টি, কিন্তু দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৪০০ জন। নতুন ভবন চালু হলে অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. মাজহারুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সব কাজই প্রায় শেষ। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ বাকি। সাধারণত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেয়া হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট সংকট ছিল। আশা করছি নতুন অর্থবছরে এ ঘাটতি পূরণ হবে। তখন প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে ভবনটি চালুর উদ্যোগ নেয়া যাবে।’

আরও