জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, আমরা একটি গভীর মানবিক সংকটের একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। ঘোষিত অর্থনৈতিক সহায়তা না এলে, আমরা চলতি বছর আগের বছরের তুলনায় মানবিক সহায়তার জন্য মাত্র ৪০ শতাংশ সম্পদ পাবার ঝুঁকিতে আছি। এটা বিশাল বিপর্যয় হতে পারে। মানুষ ভুগবে এবং মানুষ মারা যাবে।
শুক্রবার (১৪ মার্চ) কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
এন্তোনিও গুতেরেস বলেন, আমি এ পবিত্র রমজান মাসে কক্সবাজারে এসেছি একাত্মতার লক্ষ্য নিয়ে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশী সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে একাত্মতা জানাতে, যারা তাদের অত্যন্ত উদারভাবে আশ্রয় দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি এ দুর্দশা এবং একই সঙ্গে সম্ভাবনাকে আলোকিত করতে। এখানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে যারা গর্বিত। তারা সাহসী ও তাদের বিশ্বের সহায়তা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, বিগত কয়েক দশক ধরে চলে আসা বৈষম্য এবং অত্যাচারের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আট বছর আগে রাখাইন রাজ্যে ঘটে যাওয়া গণহত্যার মধ্য দিয়ে। অনেকে আবার সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মুসলিম-বিদ্বেষী নিষ্ঠুরতা থেকে পালিয়ে এসেছে। এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আগামীকাল বিশ্ব আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া মোকাবেলা দিবস উদযাপন করব।
তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখানে এসেছে সুরক্ষা, মর্যাদা ও তাদের পরিবারের জন্য নিরাপত্তার খোঁজে। আজ আমি অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এবং কথা বলেছি। তাদের সাহস আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে ও তাদের দৃঢ় সংকল্প আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। অনেকে তাদের মিয়ানমারের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা এবং এখানে আসার কথা শেয়ার করেছে।
গুতেরেস জানান, রোহিঙ্গারা বলেছে তারা তাদের দেশে ফিরতে চায়। মিয়ানমার তাদের জন্মভূমি এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরত যাওয়াই এ সংকটের প্রধান সমাধান। তবে মিয়ানমারে পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে। যতদিন পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যে সংঘাত এবং প্রথাগত অত্যাচার শেষ না হয়, ততদিন যাদের সুরক্ষা প্রয়োজন তাদের সমর্থন করতে হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখানে দায়িত্ব রয়েছে। এখনই সময় যারা কষ্টে আছে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসার। সময় আর বেশি নেই।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, এ ক্যাম্পগুলো এবং এখানে আশ্রয় নেয়া সম্প্রদায়গুলো জলবায়ু সংকটের সম্মুখীন। এখানে গ্রীষ্মকাল অত্যন্ত গরম এবং শুকনো মৌসুমে আগুনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় এবং বর্ষার মৌসুমে বন্যা-ভূমিধস বাড়িঘর ও জীবন ধ্বংস করে দেয়।
তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি এখানে মানুষ শিক্ষা, দক্ষতা তৈরি এবং স্বাধীনতার সুযোগের জন্যও ক্ষুধার্ত। সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকায় সহিংসতা, অপরাধ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে যায়। কিছু রোহিঙ্গা পরিবার মনে করে, তাদের সাগর পাড়ি দিয়ে সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাই আমাদের একটি বিশেষ দায়িত্ব আমরা যেন নিশ্চিত করি, সহায়তা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, এবং প্রমাণ করি যে পৃথিবী তাদের ভুলে যায়নি।
মানবিক সহায়তা তহবিল কাটছাঁটের বাস্তব প্রভাবের কেন্দ্র কক্সবাজার উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সংস্থা এবং অনেক মানবিক ও উন্নয়ন সংস্থা বিপুল তহবিল কাটছাঁটের সম্ভাবনার মুখোমুখি। এটি মানুষের ওপর সরাসরি এবং মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। সম্পূর্ণ শরণার্থী জনসংখ্যা এ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরো বলেন, আমরা শান্তি না আসা পর্যন্ত এ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং টেকসইভাবে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য কখনো হাল ছাড়ব না। ততদিন পর্যন্ত আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাচ্ছি, যেন তারা এগিয়ে আসে।