শেষ মুহূর্তে শিক্ষা আইন, যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষাবিদদের

এমন তাড়াহুড়ো করে আইনটি করলে সেটা শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না

অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদে বলেন, এভাবে তাড়াহুড়ো করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কারণ কি- তা আমাদের বোধগম্য নয়। মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কারে গঠিত কমিটিতে আমরা যারা আছি, তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আগামী সপ্তাহেই প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরিকল্পনা আছে। যদি সরকার প্রকৃত অর্থেই সংস্কার চায়, তবে সেসব সুপারিশ বিবেচনা করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আইন প্রণয়ন করা উচিত।

নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে শিক্ষা আইন-২০২৬ এর খসড়া প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এর ওপর মতামত দিতে বলা হয়েছে। তবে শেষ সময়ে শিক্ষা আইনের খসড়া প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, শিক্ষার মৌলিক সংস্কারের দীর্ঘদিনের যে দাবি ছিল, তা এ আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

খসড়াটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি মূলত ২০২২ সালে প্রকাশিত শিক্ষা আইন ২০২২-এর খসড়ারই পরিমার্জিত রূপ। ২০১০ সালে শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর তা কার্যকরের উদ্দেশ্যে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয় এবং ২০১৩ সালে প্রথম এ আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি চূড়ান্ত হয়নি। এরপর ১৩ বছর ধরেই আইনটি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। এর মাঝে ২০২০ ও ২০২২ সালে দুই দফায় আইনটির খসড়া প্রকাশ করা হলেও তা চূড়ান্ত হয়নি।

সর্বশেষ ১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিন ধরে যেসব দাবি ছিল, তার অধিকাংশই এতে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত খসড়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সীমিত রেখে সব শিশুর জন্য তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। যদিও দেশের শিক্ষাবিদদের দীর্ঘদিনের দাবি, অন্তত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা। এসডিজে-৪ এও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে সার্বজনীন এবং অবৈতনিক করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি এর আগে সরকারিভাবেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল এবং পরীক্ষামূলকভাবে কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালুও করা হয়েছিল।

প্রস্তাবিত খসড়ায় রয়েছে চার স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা। স্তরগুলো হচ্ছে— পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক, দশম শ্রেণী পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী উচ্চ মাধ্যমিক স্তর, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা স্তর। এ ছাড়া আলাদাভাবে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের উল্লেখ আছে আইনে। প্রাথমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাক-প্রাথমিক স্তর চালু করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগও রাখা হয়েছে।

মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আইনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষার ধারা হবে তিনটি— সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।

বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে মোটা দাগে মোট ৫টি ধারা রয়েছে। এগুলো হল সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কওমি মাদরাসা শিক্ষা এবং বিদেশী পাঠ্যক্রমে শিক্ষা। এদের মধ্যে প্রথম তিন ধারায় সরকারি শিক্ষাক্রম অনুসরণ করা হলেও কওমি মাদরাসা এবং ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের সুস্পষ্ট মনিটরিংয়েরও অভাব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়গুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় কওমি মাদরাসা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সরকার কওমি মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আইনে ইংরেজি মাধ্যম বা বিদেশী পাঠ্যক্রমের শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিদেশী শিক্ষাক্রমের আওতায় পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাক্রমে সরকার কর্তৃক, সময় সময়, নির্ধারিত বিষয়সমূহ বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করবে।

দীর্ঘদিন ধরেই কোচিং এবং গাইড বই বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। এর আগে আইনের মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নোট-গাইড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে প্রকাশিত খসড়ায় আরো তিন থেকে পাঁচ বছর নোট-গাইড প্রকাশ ও কোচিং পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকার কোচিং সেন্টার, সহায়ক পুস্তক (নোট বই) বা গাইড বই প্রকাশ ও প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করবে এবং ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে আইন কার্যকর হওয়ার তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যে এসব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের উদ্যোগ নেবে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় নতুন উদ্যোগ হিসেবে জাতীয় শিক্ষা একাডেমি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে জাতীয় শিক্ষা একাডেমির উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা গবেষণা, উদ্ভাবন ও নীতিগত সহায়তা প্রদান; ও পাঠ্যক্রম মূল্যায়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে সরকারকে পরামর্শ প্রদান। সরকার বিধির মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষা একাডেমির গঠন, কার্যাবলী, ক্ষমতা ও পরিচালনা পদ্ধতি নির্ধারণ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার বিষয়গুলো প্রাথমিক স্তরে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ও মাধ্যমিক স্তরে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে বেসরকারি শিক্ষকদের বড় অংশ প্রশিক্ষণের বাইরে থাকেন। খসড়ায় জাতীয় শিক্ষা একাডেমিতেও বেসরকারি শিক্ষকরা প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন কিনা- বিষয়টি সুস্পষ্ট করা হয়নি।

এদিকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর মতামত নেয়ার জন্য আইনের খসড়াটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে ১ ফেব্রুয়ারি (রোববার)। মতামত দেয়ার সময় রাখা হয়েছে মাত্র ছয় দিন অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি এবং শবে বরাতের ছুটি মিলিয়ে তিন দিনই সরকারি ছুটি। তাই সরকারের বেঁধে দেয়া এ সময় মতামত প্রদানের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এমন তাড়াহুড়ো করে আইনটি করলে সেটা শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মতামত প্রদানের জন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু এত স্বল্প সময়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং আইনটি যথাযথভাবে বিশ্লেষণই সম্ভব নয়।

এদিকে গত বছরের অক্টোবরে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তারা সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে।

এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নেও অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৯ সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই কমিটি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শতাধিক সুপারিশ করেছিল। তবে সেসব সুপারিশের অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদে বলেন, এভাবে তাড়াহুড়ো করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কারণ কি- তা আমাদের বোধগম্য নয়। মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কারে গঠিত কমিটিতে আমরা যারা আছি, তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আগামী সপ্তাহেই প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরিকল্পনা আছে। যদি সরকার প্রকৃত অর্থেই সংস্কার চায়, তবে সেসব সুপারিশ বিবেচনা করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আইন প্রণয়ন করা উচিত। কিন্তু এখন আমরা যেভাবে তাড়াহুড়ো করে আইন প্রণয়নের চেষ্টা দেখছি, তাতে এ আইনের মাধ্যমে শিক্ষায় সংস্কার হবে নাকি সংস্কার প্রক্রিয়া আরো বাধাগ্রস্ত হবে- তা নিয়ে সংশয় আছে।

আইনটির খসড়ার বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, এবারই প্রথমবারের মতো শিক্ষা আইন হচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে অনেকগুলো পৃথক পৃথক নীতিমালা, পরিপত্র হচ্ছে। এ আইন হলে সব বিষয়গুলো, এমনকি যেসব বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা আছে- সেগুলোও একটি আইনের মধ্যে আসবে। এর ফলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, অর্থ বরাদ্দের মতো বিষয়গুলোর জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি হবে।

আরও