রংপুরে ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতাল

তিন বছর আগে কার্যক্রম বন্ধ হলেও পড়ে আছে চিকিৎসা সরঞ্জাম

দেশে কভিড মহামারী শুরু হলেও ২০২০ সালে রংপুর নগরে স্থপান করা হয় ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতাল।

দেশে কভিড মহামারী শুরু হলেও ২০২০ সালে রংপুর নগরে স্থপান করা হয় ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতাল। শিশু হাসপাতালে স্থাপিত চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে ১০০ শয্যা ছিল। এর মধ্যে সাধারণ শয্যা ৯০টি, বাকি ১০টি ছিল আইসিইউ বেড। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে আরো ১৫টি আইসিইউ বেড সংযুক্ত করা হয়। কভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২২ সালে বন্ধ করা হয় হাসপাতালটির কার্যক্রম। এরপর থেকে সেখানেই অব্যবহৃত পড়ে আছে মূল্যবান ২৫টি আইসিইউ বেড, ৯০টি সাধারণ বেড, কার্ডিয়াক মনিটরসহ আধুনিক সব চিকিৎসা সরঞ্জাম।

দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় মূল্যবান বেডগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। রংপুর বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলো যখন আইসিইউ বেড সংকট, তখন সিদ্ধান্তের অভাবে নতুন আইসিইউ বেড বছরে পর বছর পড়ে থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন রোগী ও তার স্বজনরা।

সাধারণত প্রতিটি আইসিইউ বেডের সঙ্গে যুক্ত থাকে ভেন্টিলেটর মেশিন ও কার্ডিয়াক মনিটর। এগুলো সচল আছে কিনা জানতে চাইলে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘একজন নার্স হিসেবে অসুস্থ রোগীর সেবা করতে পারি। কিন্তু আইসিইউ বেডগুলো চালু করা টেকনিক্যাল বিষয়। এজন্য ইঞ্জিনিয়ারসহ আরো লোকবল দরকার। আমার মতো নার্স দিয়ে এগুলো করা সম্ভব নয়।’

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের পরিসংখ্যান শাখার তথ্য বলছে, কভিড শুরুর পর রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৪৯ জনের পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কভিড শনাক্ত হয় ৬৪ হাজার ৯৯৩ জনের শরীরে। মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৯৩ জনের। বিভাগে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে দিনাজপুর জেলায়; ৩৪১ জন। সবচেয়ে কম মারা গেছে গাইবান্ধা জেলায়; ৬৬ জন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয়ের পরিসংখ্যানবিদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখনো বিভাগের কভিড পরিস্থিতির বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় তথ্য পাঠাই। তবে এখন আর কভিড আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায় না।’

এদিকে কভিড পরীক্ষার জন্য রোগী না আসায় এবং বিভিন্ন কাজে কভিডের জীবাণু শনাক্তের বাধ্যবাধকতা না থাকায় রংপুর মেডিকেল কলেজে স্থাপিত পিসিআর মেশিনটিও ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় মেশিনটিও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে মেশিনটি বন্ধ থাকলেও ভালো রয়েছে বলে দাবি করেন বিভাগটির সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সবুর খান ও ডা. এমএ আজিজ। তারা বলেন, ‘মাঝে মাঝে মেশিন ভালো রাখতে ট্রায়াল দেয়া হয়। তবে রিএজেন্টের ঘাটতি রয়েছে। কভিডের সময় মেশিনে প্রায় ১ লাখের বেশি রোগীর পরীক্ষা করা হয়েছে।’

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং রমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ডেডিকেটেড হাসপাতালে বিদ্যমান আইসিইউ বেডসহ অন্যান্য চিকিৎসা উপকরণ ব্যবহারেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের দ্বিধাবিভক্ত মনোভাব থাকায় সহজে ঐকমত্যে পৌঁছা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রংপুর বিভাগ ও জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মামুনুর রহমান বলেন, ‘রংপুর বিভাগের মধ্যে রমেক হাসপাতাল চিকিৎসার জন্য অন্যতম। প্রতিদিন অনেক মানুষ চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। কিন্তু আইসিইউ বেডের স্বল্পতার কারণে গুরুতর রোগী ভর্তি হতে পারছেন না। অথচ ক্রিটিক্যাল মেডিসিনে দক্ষ চিকিৎসকসহ টেকনোলজিস্ট থাকার পরও আইসিইউ বেডের অভাবে চিকিৎসা সুবিধা দিতে পারছেন না। ফেলে না রেখে মূল্যবান আইসিইউ বেডগুলো রমেক হাসপাতালে দেয়া হলেও আরো বেশি জরুরি রোগীর সেবা দেয়া যেত।’

ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) হচ্ছে হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। রমেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সংস্কারের অভাবে আইসিইউ ইউনিট চলছে ধুঁকে ধুঁকে। ১০টি পুরনো আইসিইউ বেডের মধ্যে প্রায় সময় দুই-একটি অচল থাকে।

এ ব্যাপারে রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইসিইউ বেডসহ অন্যান্য চিকিৎসা উপকরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ঐকমত্যে আসতে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। ডেডিকেটেড হাসপাতালের দায়িত্বে রয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। তারা উপকরণগুলো বুঝে না দিলে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। নিয়ম ছাড়া কিছু করতে গেলে পরে অডিট আপত্তি আসতে পারে। তবে চিকিৎসা উপকরণগুলো এভাবে পড়ে থাকলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তো থাকবেই। এ বিষয়ে মেডিকেলের উপপরিচালককে আহ্বায়ক ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধিকে সদস্য করে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা আছে। কমিটির সদস্যরা যেটি ভালো হবে সেটি করবেন।’

রংপুর সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, ‘সিভিল সার্জনের জমিতে ভবনটি নির্মিত হলেও কভিড চিকিৎসার ওষুধ সরবরাহ করেছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। এমনকি যে খরচ হয়েছে তাও করেছে তারা। এজন্য চিকিৎসা উপকরণ কাউকে সরবরাহ করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা প্রয়োজন।’

তবে সাত সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি আছে—এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কারণ তিনি মার্চে মাসে এখানে যোগদান করেছেন। জরুরি প্রয়োজনে ডেডিকেটেড হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়েছিল উল্লেখ করে সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, ‘শিশু হাসপাতালটি দ্রুত চালু হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এজন্য লোকবল চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।’

আরও