বাড়ছে পক্ষ নেয়ার চাপ

সৌদি-হুথি উত্তেজনায় ‘উভয় সংকটে’ পাকিস্তান

গতকাল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনায় সব পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয় বলে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে

সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই বাড়তে থাকায় যেকোনো একটি পক্ষ নেয়ার চাপের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। একদিকে রিয়াদের প্রতিরক্ষা অংশীদার ও অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা ইসলামাবাদের জন্য এবার নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানান হয়, চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন ও সৌদি বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া লড়াই পাকিস্তানের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দেখা দিয়েছে। গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা জোটেরও এটি প্রথম বড় পরীক্ষা। ‘মক্কা প্যাক্ট’ অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে চুক্তিবদ্ধ সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, চলমান হুথি হুমকি ইসলামাবাদকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার তুলনায় হুথিদের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত পাকিস্তানের জন্য আরো সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করেছে।

রয়টার্সকে দুই পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী সৌদি এলাকায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পাকিস্তান উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। এসব প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে প্রায়ই উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে একই সময়ে পাকিস্তান জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরশীল। ইরান ও হুথিরা এরই মধ্যে এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে তেহরানকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেয়ার ঝুঁকিও নিতে চাইছে না ইসলামাবাদ।

ইরানকে সতর্কবার্তা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই উত্তেজনা কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। চলতি সপ্তাহে তেহরানকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে ইসলামাবাদ। এতে ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।

গতকাল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনায় সব পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয় বলে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে।

মধ্যস্থতাকারী, নাকি সংঘাতের পক্ষ?

প্রকাশ্যে ইরানি কর্মকর্তারা পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রশংসা করেছেন এবং পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক প্রতিরক্ষা জোটকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন না বলে জানিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ইরানের অবস্থান ভিন্ন বলে জানিয়েছেন দেশটির তিনটি সূত্র।

তাদের মতে, পাকিস্তানের উদ্দেশ্য ভালো হলেও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা ইসলামাবাদের নেই।

চ্যাথাম হাউজের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, কাতার ও ওমানের মতো দেশ যে অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় আসতে পারত, পাকিস্তানের তা নেই।

তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের একটি বিশেষ সুবিধা। ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক কামরান বোখারি বলেন, পাকিস্তান সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এমন বার্তা পৌঁছে দিতে পারে, যা কোনো পুরোপুরি নিরপেক্ষ দেশ পারত না।

তবে সংঘাত আরো বাড়লে এ ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তার ভাষায়, বার্তা আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক অবস্থান এক বিষয়। সক্রিয় বিমান প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা সহায়তা দেয়া হলে পাকিস্তান আর শুধু স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থাকবে না, বরং সংঘাতের সরাসরি অংশে পরিণত হবে।

আরও