সিপিডির সংলাপে জ্বালানিমন্ত্রী

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হলে সাময়িকভাবে গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে

কারিগরি ত্রুটির কারণে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউর একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই সপ্তাহ আগে। মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হলে কারিগরি সমন্বয় প্রয়োজন।

যে কারণে এলএনজি টার্মিনালের পুরো সিস্টেমটি ৭২ ঘণ্টার (তিনদিন) জন্য বন্ধ রাখতে হবে। টার্মিনাল বন্ধে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

গতকাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন মন্ত্রী। ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু আ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে।

মন্ত্রী বলেন, ‘এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিনদিন বন্ধ রাখা লাগবে। যার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘গ্যাস খাতে আজকে যে অবস্থা সেখানে শিল্পে সমস্যা হচ্ছে, বিদ্যুতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। যার ফলে শিল্প-কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আমরা এ ব্যাপারে ভীষণভাবে সিরিয়াস। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে তিনবার শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব সমস্যা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায় তিনি সে চেষ্টা করেছেন।’

সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নেই। কারণ এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’

ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই চলমান সংকট শুরু হয়েছিল। যদিও বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কারণ নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না থাকা পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেয়াও সম্ভব নয়। বিদেশী প্রকৌশলীরা যতক্ষণ পর্যন্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই। এখন শুধু দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। আর যাতে কম লোডশেডিং হয় ও ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাস দিতে পারি, এ ম্যানেজমেন্টটা করা।’

গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০২৯ সালকে লক্ষ্য করে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এরই মধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরো তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির। তিনি জ্বালানি সংকট কাটাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, ‘দেশে জ্বালানি সংকট এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। মূলত অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে একদিকে আমদানির ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রারও অপচয় হচ্ছে।’

পরিস্থিতি সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের সুপারিশ করে সিপিডি। একই সঙ্গে সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল রিজার্ভ বা জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়। এছাড়া আমদানি করা জ্বালানির মূল্য ওঠানামা সামলাতে এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে সুনির্দিষ্ট নীতির আহ্বান জানানো হয়।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোয় ৩৫-৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এ সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশী অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন।’ তিনি ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ ঘোষণার দাবি জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে জ্বালানি খাতে সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি ও নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি না থাকায় সংকট আরো গভীর হয়েছে। শিল্প ও কৃষি রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দেশীয় কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ।’ দ্রুত সংকট মোকাবেলা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল’ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর তাগিদ দেন তিনি।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেয়ার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘জ্বালানি সংকট কাটাতে কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত দূর করতে পোর্টের খালাস প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্কছাড় দেয়া এবং ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প সোলারে রূপান্তর করলে দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, সংকট সমাধানের চেষ্টা না করে বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও আবাসিকে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করার কারণে সরকার এখন বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কোনো সরকারের পক্ষেই হঠাৎ এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। তাই বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ও চুরি বন্ধের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্প খাতকেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর শিল্পে জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের স্পষ্ট অগ্রাধিকারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি।’ লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় ও শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেয়ার তাগিদ দেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

সংলাপে আরো অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।

আরও