স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির অঙ্গীকার, পরিকল্পনা নেই টেকসই ব্যবস্থা গড়ার

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, সেবার মানে বৈষম্য ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় ভুগছে। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর এ খাত বহুদিন ধরেই অবহেলিত।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, সেবার মানে বৈষম্য ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় ভুগছে। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর এ খাত বহুদিন ধরেই অবহেলিত। খাতটিতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ইতিবাচক হলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন ও গুণগত মান উন্নয়ন নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনার কথা উঠে আসেনি। বিভিন্ন দিকনির্দেশনা থাকলেও সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তাও পরিষ্কার নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত বা সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণ করলেই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হবে না। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ও অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে রোগীদের যথাযথ সেবা দেয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি পূরণ, সেবা প্রদানে তাদের উৎসাহ প্রদান এবং স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের রূপরেখার অভাব রয়েছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে। তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের মূল চ্যালেঞ্জ অবকাঠামোর অভাব নয়; বরং দক্ষ জনবল, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারে এ মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন দলের প্রতিশ্রুতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি প্রায় সবাই দিয়েছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক জনসভায় বলেছেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের মানুষকে ঢাকামুখী হতে হয়, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দেশের কোনো জেলাই মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না। ঠাকুরগাঁওয়েও একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে।’ জামায়াত ইসলামীর পলিসি সামিট-২০২৬-এ বলা হয়েছে, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক এবং পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হবে। ‘ফার্স্ট থাউজ্যান্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করব। চিকিৎসার জন্য যেন কাউকে ঢাকায় আসতে না হয়, সেজন্য আমরা বিভাগীয় শহরগুলোর হাসপাতালকে বিশেষায়িত হাসপাতালে রূপান্তর করব। হাসপাতালগুলো এমনভাবে তৈরি করব যেন রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না হয়।’

সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দাবি করে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এলাকাভিত্তিক বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করার পরিকল্পনা করছি। অর্থাৎ কমিউনিটি হাসপাতালগুলোকে আরো উন্নত করা এবং সেখানে বিভিন্ন ফ্যাসিলিটিজগুলো দেয়া, যাতে একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সাধারণ চিকিৎসাসেবা পায়। আশা রাখি বড় বিনিয়োগ করা ছাড়াও আমরা ভালো ফলাফল পাব।’

বিগত বছরগুলোতে দেশের জিডিপির ১ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বিএনপির রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের রূপরেখায় স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের ঘোষণা আছে। পাশাপাশি ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ ও ‘বিনাচিকিৎসায় কোনো মৃত্যু নয়’ নীতি গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি স্বাস্থ্য কার্ড চালু এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের অঙ্গীকারও করেছে। এছাড়া আছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) আদলে একটি ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ চালুর প্রতিশ্রুতি।

গত সপ্তাহে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান এক জনসভায় বলেন, ‘সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যাতে সামান্য অসুস্থতায় হাসপাতালের বারান্দায় ভিড় না করে নিজ বাড়িতেই প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে পারেন, সেজন্য বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সারা দেশে গ্রামে গ্রামে “‍হেলথ কেয়ারার” নিয়োগ দেয়া হবে।’

পল্লী চিকিৎসক মডেলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ হেলথ কেয়ারারদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তারা নিয়মিত প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। ছোটখাটো রোগের জন্য তাদের আর কষ্ট করে দূরবর্তী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হবে না; বরং ঘরে বসেই তারা বিনামূল্যে পরামর্শ ও ওষুধ পাবেন।’

এ বিষয়ে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ গুরুতর অসুস্থ না হলে হাসপাতালে আসতে চায় না। কারণ আমাদের স্বাস্থ্য খরচ অনেক বেশি। এটার পরিবর্তন দরকার। আমাদের ফোকাসটা ট্রিটমেন্ট থেকে প্রিভেনশনে আনতে হবে। আমরা মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বা স্বাস্থ্যসেবাকে নিয়ে যাব। যাতে একটা মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই তার লক্ষণগুলো ধরা পড়ে এবং সে অনুযায়ী যাতে হেলথ প্রমোশন করা যায়। আমরা চাই, এসব রোগে ভোগার প্রথম স্টেজেই তাদের আইডেন্টিফিকেশন করতে এবং চিকিৎসা দিতে। তাতে মানুষের আর্থিক ব্যয় কম হবে, মানুষ কম রোগে ভুগবে। হাসপাতালগুলোতে এত ভিড় থাকবে না। আমরা প্রিভেনশনের ওপর মূল ফোকাস দেব।’

এনসিপি তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ইশতাহারে তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। জাতীয় ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (এএইচআর), ইউনিক হেলথ আইডি, জিপিএস-চালিত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি।

এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার রোগী হাসপাতালের ফ্লোরে থাকে। তারা সিট পায় না। কোনো রোগীকে যেন ফ্লোরে সেবা নেয়া না লাগে সেদিকে আমরা কাজ করব। এছাড়া আমাদের সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ বেড নেই। টাকার অভাবে দরিদ্ররা সেবা নিতে পারে না। আইসিইউ বেড বাড়ানো জরুরি। আরেকটি বিষয় নিয়ে কাজ করা জরুরি সেটি হলো, আমাদের স্বাস্থ্যশিক্ষা খাত। এদিকটায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।’

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে যে অঙ্গীকার করছে, সেগুলো মূলত কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৮ কোটি মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠন, বাজেট বৃদ্ধি এবং মানুষের আউট-অব-পকেট ব্যয় কমানোর বিষয়গুলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্ট নয়। একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য প্রমোটিভ, প্রিভেন্টিভ, কিউরেটিভ, রিহ্যাবিলিটেটিভ ও প্যালিয়েটিভ—এই পাঁচ স্তম্ভের সমন্বয় জরুরি হলেও রাজনৈতিক দলগুলো স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল হাসপাতাল, ডাক্তার ও ওষুধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছে। জনবল কাঠামোতেও বড় সংকট রয়েছে; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের বিপরীতে বাংলাদেশে নার্স ও টেকনোলজিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত কম। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যকর করা, শহরের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একটি দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোতে রূপান্তরের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা চাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেন সব রাজনৈতিক দলেরই প্রতিশ্রুতিতে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত থাকে। বিএনপি স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলেছে। তবে তারা যেটা বোঝাতে চেয়েছে বরাদ্দ প্রতি বছর একটু একটু করে বাড়ানো হবে। এটি হলে খুবই ভালো হয়। তবে আগামী দিনে যে সরকারই আসুক জনগণবান্ধব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করতে হবে। যে বরাদ্দটা দেয় তা সঠিকভাবে জনগণের জন্য ব্যবহৃত হয় সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।’

আরও