এক বছরে সিরাজগঞ্জে ৪ হাজার ৮০৩টি বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ জেলায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩টি সংসার ভেঙেছে। বিপরীতে একই সময়ে নতুন বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে ১৩ হাজার ৩১৭টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্তি, জুয়া, পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের মতো পুরনো সমস্যার সঙ্গে মোবাইল আসক্তি, মানসিক নির্যাতন এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পরিবারের অন্য সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপও সংসার ভাঙার কারণ হয়ে উঠছে।
বিচ্ছেদের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করেও সামাজিক সংকটের এ চিত্র পাওয়া গেছে। রায়গঞ্জ উপজেলার কোদলা গ্রামের মায়া খাতুনের বিয়ে হয়েছিল মাত্র আট মাস আগে। তার বয়স ১৪ বছর। শিখন নামে এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মায়ার অভিযোগ, বিয়েতে ৩০ হাজার টাকা যৌতুক বাকি থাকায় নিকাহ রেজিস্ট্রারের সামনে তাকে মারধর করা হয় এবং গলায় ছুরি ঠেকিয়ে জোর করে তালাকনামায় স্বাক্ষর নেয়া হয়। তার বিধবা মা ওই যৌতুকের টাকা দিতে পারেননি।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা এলাকার তাসলিমা ছয় বছর সংসার করার পর এক কন্যাসন্তান নিয়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষ্য, শাশুড়ির নির্যাতনের পাশাপাশি স্বামী নিয়মিত নেশা করে এসে তাকে অত্যাচার করতেন। এমন সংসারে আর থাকতে চান না জানিয়ে তিনি লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগও করেছেন।
সদর উপজেলার শিবনাথপুর গ্রামের দুই সন্তানের মা শিল্পীর অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি জানান, স্বামী তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। কিছুদিন পর তালাকনামাও পাঠান। বিয়ের পর থেকেই স্বামী, শাশুড়ি, দেবর ও ননদ তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ তার।
জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিরাজগঞ্জে ১৩ হাজার ৩১৭টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে ৪ হাজার ৮০৩টি। জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন জানান, চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে ডিসেম্বরের শেষে। তবে এ বছরের আট মাসের একটি চিত্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের একটি কাজী অফিসে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৫২টি বিয়ে নিবন্ধিত হলেও বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে ১৫৭টি। সদর উপজেলার কাজী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ১ হাজার ৬৭০টি বিয়ের বিপরীতে বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে ৮৫০টি।
কাজী সমিতির সভাপতি নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, চলতি বছর তালাক নিবন্ধনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় তুলনামূলক বেশি। তার ভাষ্য, বিবাহবিচ্ছেদের কারণগুলোর মধ্যে স্বামীর মাদকাসক্তি, ক্যাসিনো জুয়াসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে না পারার বিষয়টি রয়েছে। আবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগেও বিচ্ছেদ হচ্ছে। একান্নবর্তী সংসারে থাকতে না চাওয়ার বিষয়টিও তিনি একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জেলায় বিবাহবিচ্ছেদের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধিকে উদ্বেগের বিষয় বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহীদুল হাসান। তার মতে, মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, ধৈর্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যতা ও সামাজিক অস্থিরতাও সংসার ভাঙার পেছনে ভূমিকা রাখছে। বিবাহবিচ্ছেদের কুফল ও পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি এ বিষয়ে সমাজের দায়িত্বশীলদের আরো বেশি ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
সব বিচ্ছেদ যে চূড়ান্ত পরিণতিতে যাচ্ছে, তা নয়। বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে অনেক সংসারও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) কাফি আল আজাদ বলেন, ‘সংসার ভাঙার ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই কিছু দায় থাকে। পুরুষদের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি, জুয়া, পরকীয়া, স্ত্রীকে মারধর এবং ভরণপোষণ দিতে না পারার মতো বিষয় সামনে আসে। শিক্ষিত পরিবারে শারীরিক নির্যাতনের বদলে মানসিক নির্যাতনের কারণেও একসময় সম্পর্ক ভেঙে যায়। আবার স্বামীর পরিবারের সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকেও দাম্পত্য কলহ তৈরি হয়।’
নারীদের ক্ষেত্রে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ, স্বামীর কথা না মানা এবং সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ থেকে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার কথা জানান তিনি। তবে এসব বিরোধের অনেক ক্ষেত্রেই সমঝোতার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন কাফি আল আজাদ।
তিনি জানান, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে ৮০-৮৫ শতাংশ অভিযোগ আপস-মীমাংসায় নেয়া সম্ভব হচ্ছে। দুই পক্ষকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্ব বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যৌতুক ও নারী-সংক্রান্ত ৪৬১টি অভিযোগ লিগ্যাল এইড অফিসে আসে। এর মধ্যে ৪৪৮টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে ভেঙে যাওয়া ৪৫৭টি সংসার জোড়া লাগানো সম্ভব হয়েছে।