ভারী শিল্পে শুল্কের চাপ, ব্যয় বাড়বে উৎপাদনে

উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান কারখানা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্যোক্তাদের সামনে।

এরই মধ্যে ঢাকাসহ চট্টগ্রামে মাঝারি মানের অন্তত ১৫টি ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যেগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ টন রড উৎপাদনে সক্ষম ছিল। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, শিল্প ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের মনোযোগ দেয়াটা জরুরি হলেও বাস্তবে ঘটছে উল্টো।

২ জুন উপস্থাপিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে দেশের সবচেয়ে ভারী শিল্প হিসেবে পরিচিত ইস্পাত খাতে মূল্য সংযোজন কর যুক্ত করায় মোট করহার বেড়েছে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে প্রতি টনে ১ হাজার ৫০০ টাকা শুল্ক নির্ধারিত ছিল। নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে এ শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলেও কাঁচামাল আমদানিতে নতুন করে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করা হয়েছে প্রতি টনে ১ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ আমদানি পর্যায়ে কর কার্যত আগের শুল্কের চেয়ে ৩০০ টাকা বেড়ে গেছে। এছাড়া অগ্রিম আয়কর আগে যেখানে প্রতি টনে ৫০০ টাকা ছিল, সেটি বাড়িয়ে এখন করা হয়েছে ৬০০ টাকা। ইস্পাত খাতে এ অগ্রিম কর পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে না। রড তৈরির অপর গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল স্পঞ্জ আয়রন ও পিগ আয়রনের আমদানিতেও এবার ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, এ ট্যাক্স যুক্ত হয়ে প্রতি টনে খরচ বাড়বে আরো প্রায় ১০০ টাকা।

এ তো গেল উৎপাদন পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধির হিসাব। এবার বিক্রয় পর্যায়েও বাড়বে খরচ। আগে রড বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি টনে ভ্যাট ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা, যা এবার প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ বিক্রয় পর্যায়ে প্রতি টনে কর বেড়েছে ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে আমদানি ও বিক্রি পর্যায়ে ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তাদের এখন থেকে প্রতি টন রডের বিপরীতে অতিরিক্ত কর গুনতে হবে ১ হাজার টাকা।

জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রড উৎপাদনে প্রতি টনে আমাদের ব্যয় সরাসরি ১ হাজার টাকা বেড়ে যাবে। এর ওপর সুদসহ অন্য চাপ তো রয়েছেই। এ ১ হাজার টাকা প্রতি টনে বাড়ানো মানে অতিরিক্ত কয়েক ধরনের বোঝা আমাদের কাঁধে এসে পড়ছে। আমাদের উৎপাদিত রডের বড় অংশ ব্যবহার হয় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। অথচ বাজেট প্রস্তাবে ওই খাতে উল্লেখযোগ্য হারে খরচ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। ফলে নিশ্চিতভাবেই দেশে রডের ব্যবহার আরো কমে যাবে। ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা কমে যাওয়া এবং তার ওপর এ নতুন করের বোঝা চাপিয়ে দেয়াটা আমাদেরই (উৎপাদক) বহন করতে হবে। এরই মধ্যে ইস্পাত খাতের মাঝারি মানের অনেক কারখানা উৎপাদন একেবারে সীমিত করে এনেছে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এখন এ তালিকা আরো দীর্ঘ হবে।’

সামনের অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের ব্যয় অনেক কমে যাবে। এতে ভারী শিল্প খাতের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত থাকবে। তারা বলছেন, সরকার দেশে বিনিয়োগ আনার

জন্য যে চেষ্টা করছে সেটা সামনে আরো কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ স্থানীয় উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে বাইরের কোনো বিনিয়োগকারী এসে ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।

বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলীহুসাইন পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইস্পাতের কাঁচামাল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি প্রত্যাহার করা হয়েছে কিন্তু অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা আগে ছিল না। একইভাবে বিক্রি পর্যায়েও ভ্যাটের হার বেড়েছে। ফলে আমদানিতে কাস্টমস শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তাতে ইতিবাচক কোনো প্রভাব তো পড়লই না, বরং সামগ্রিকভাবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ইনভাইট করা হলে তারাও আগে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের শুল্ক-কাঠামোসহ সবকিছু ভালোভাবে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। এবার সুযোগ ছিল পুরনো বাজেট কাঠামোর ধ্যান-ধারণা থেকে সরে এসে নতুন কিছু সামনে আনার। ব্যবসা খাতের বাইরে গিয়েও যদি বলি প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়াটা কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার মতো।’

ইস্পাত খাতের মতো সিমেন্ট শিল্পেও শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানির পরিসংখ্যানে ধরা পড়েছে সেই চিত্র। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ক্লিংকার আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৯৬ লাখ টন। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১০ লাখ টন। অর্থাৎ ১১ মাসে ক্লিংকার আমদানি কমেছে প্রায় ১৪ লাখ টন, যা ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি সিমেন্ট খাতে উৎপাদনের গতি হ্রাসের প্রতিফলন।

সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় সিমেন্টের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। একদিকে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে চাহিদা। সিমেন্ট ক্লিংকার আমদানির ক্ষেত্রে আগে কাস্টমস শুল্ক ছিল প্রতি টনে ৭০০ টাকা। এখন নির্দিষ্ট শুল্ক বাদ দিয়ে মূল্যের ওপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্কহার আরোপ করা হয়েছে। তবে যাদের এ খাতের শিল্প-কারখানা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এ হার হবে ১৫ শতাংশ।

ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুল্ক হার যেটা হয়েছে তাতে সিমেন্ট উৎপাদনে আমদের সরাসরি ব্যয় বেড়ে গেল। এছাড়া করপোরেট ট্যাক্সসহ শুল্ক কর হারে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে নতুন ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য অথবা ইন্ডাস্ট্রি বড় করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান অসম্ভব হয়ে যাবে ।’

প্রস্তাবিত বাজেটে প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যে ভ্যাটের হার দ্বিগুণ করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের তৈরি সব ধরনের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী, হাইজেনিক ও টয়লেট্রিজ সামগ্রীসহ অনুরূপ যেকোনো পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাটের হার সাড়ে ৭ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, এখানেই তো ৬ শতাংশের মতো হিট করল। গ্যাসের বিলও ব্যাপক বেড়েছে। ব্যাংক আর গ্যাস এ দুটো ফ্যাক্টর আমাদের কতটা চাপে রেখেছে তা বলে বোঝানো যাবে না। সব ধরনের বিনিয়োগকে এগুলো বাধাগ্রস্ত করছে। এখন এলএনজির ওপর যে ভ্যাট প্রত্যাহার হয়েছে এটা যদি ইন্ডাস্ট্রিতে সুযোগ পায় তাহলে অন্তত স্বস্তি মিলবে। তাহলে প্রডাকশন কস্ট একদিক দিয়ে কমে আসবে। আমি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিরসরাইতে ইকোনমিক জোনে কাজ ধরতে গিয়ে আবার স্টপ করে দিয়েছি। ডলারের যে সংকট তৈরি হয়েছিল তাতেই আর্টিফিশিয়াল লেদারের এ ৫০০ কোটি টাকার প্রজেক্টটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। নতুন করে এমন কোনো পরিবেশ পাচ্ছি না যে এটা আবার শুরু করব।’

দেশে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ভূমিকা আছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই)। এ কনগ্লোমারেটের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বিশ্বব্যাংকের সদস্য প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। কারখানা নির্মাণে এ চুক্তির আওতায় আইএফসি ১০ কোটি ডলার অর্থায়ন করবে। এটি হবে দেশের প্রথম ‘ক্লাইমেট–স্মার্ট’ ইস্পাত কারখানা। মেঘনা রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস লিমিটেডের ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগে আধুনিক এ কারখানায় বছরে ১৫ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদিত হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০ হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইস্পাতের মাথাপিছু ব্যবহারে আমরা পৃথিবীতে সবচেয়ে পিছিয়ে আছি। প্রতিটি ব্যবসায়িক পদক্ষেপের পেছনে মূল উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এরই মধ্যে রড উৎপাদনে একটা বড় বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েছি। এখন এমনিতে চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। তার ওপর শুল্কনীতি কাঠামো আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ সময় প্রয়োজন ছিল শিল্পের উৎপাদনকে সহায়তা করার দিকে নজর দেয়া। নতুন করে শিল্প সম্প্রসারণের পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সহজ কথায় বিনিয়োগ না হলে শিল্প হবে না আর শিল্প না হলে কর্মসংস্থান হবে না। বিনিয়োগ, শিল্প আর কর্মসংস্থান—এ তিনটা বিষয় এক সুতোয় বাঁধা, যেগুলোর সম্প্রসারণের নীতি আমরা বাজেটে দেখতে পাইনি ।’

আরও