রাজনীতি-সংস্কৃতির উত্তপ্ত কেন্দ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ থেকে মুফতি তাহেরী-মাওলানা সাজিদুর

একসময় সংগীত, সাহিত্য ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিচিতি পেয়েছিল দেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ ও কবি আল মাহমুদের জন্মভূমি এ জেলা স্বদেশী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা।

অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানে একের পর এক হামলা ও প্রতিবন্ধকতার ঘটনায় সেই পরিচয় ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়েছে। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত সংগীতাঙ্গনে দুই দফা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার, বন্ধ করা হয়েছে চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী। দুই বছর বন্ধ ছিল তিতাস নদীর ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট পুলিশ লাইনসে জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। পণ্ড হয়ে যায় অনুষ্ঠানটি। এরপর ভবিষ্যতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন না করার দাবিও জানানো হয়।

একসময় যে জেলার পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিলেন সংস্কৃতিসাধকরা, বর্তমানে সেই জেলার সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করেছেন মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরী এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা মাওলানা সাজিদুর রহমানের মতো ইসলামী বক্তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত বছরগুলোতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানে হামলার বিচার না হওয়ায় জেলায় সাংস্কৃতিক চর্চাবিরোধী একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। নিজেদের প্রভাব ধরে রাখা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ রোধে এ গোষ্ঠী ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করছে বলেও মনে করেন তারা। এ বাস্তবতাই ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে রাজনীতি ও সংস্কৃতির উত্তপ্ত কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ঘটনার পর মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ। সেখানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন না করাসহ কয়েকটি দাবি জানানো হয়। পুলিশ সুপার দাবিগুলো মেনে নেয়ার পাশাপাশি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

উপমহাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত তিতাসবিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এমন যে গান-বাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো আর কি। ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে যা ব্যবস্থা নেয়া দরকার, সেটা নিয়েছি।’

তবে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। এ জনপদের লোককাহিনীতে ছড়িয়ে আছে সমৃদ্ধ লোকায়ত ঐতিহ্য; ধ্রুপদি সংগীতেও রয়েছে নিজস্ব ঘরানা। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অন্যতম সমৃদ্ধ মাধ্যম পুতুলনাচের জন্যও ব্রাহ্মণবাড়িয়া একসময় বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। প্রচলিত আছে, নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল উপমহাদেশে প্রথম পুতুলনাচের প্রচলন করেন। জেলাটি বহু খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, ধর্মীয় পণ্ডিত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্ম ও সাধনভূমি।

সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ, মহর্ষি আনন্দস্বামী, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, মনমোহন দত্ত ও ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর মতো সংগীতসাধকের জন্ম ও প্রতিভার বিকাশ ঘটেছে এ জনপদে। ছান্দসিক কবি আবদুল কাদির, প্রবোধচন্দ্র সেন, অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও কবি আল মাহমুদের মতো বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্মস্থানও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ইসলামী পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ আল্লামা তাজুল ইসলাম এবং মাওলানা সিরাজুল ইসলামসহ বহু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও এ জেলার সন্তান। শুধু সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চা নয়, রাজনৈতিক ইতিহাসেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈসা খাঁর লালনভূমি ছিল এ অঞ্চল। নবাব সৈয়দ শামসুল হুদা, ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত, ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অলি আহাদ ও আবদুল কুদ্দুস মাখনের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও এ জেলায় জন্মেছেন।

পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় নেতৃত্বেরও ইতিহাস রয়েছে। জেলায় কওমি মাদরাসা শিক্ষার বিকাশ ও ঐতিহাসিক ভিত্তি গড়ে ওঠে মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জামেয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯১৪ সালে স্থানীয় পীর ও আলেম শাহ সুফি মুহাম্মদ ইউনুছ (রহ.)-এর প্রচেষ্টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পাইকপাড়ায় মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে ও আধ্যাত্মিক চেতনায় এর ইসলামী শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে পুরো জেলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রভাবশালী ইসলামী নেতৃত্বের একটি বড় অংশ জামেয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। মাদরাসাটির শায়খুল হাদিস আল্লামা সাজিদুর রহমান বর্তমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব। পাশাপাশি তিনি জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা। জেলার কওমি মাদরাসা, ধর্মীয় সংগঠন ও সামাজিক পরিসরে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।

অন্যদিকে কওমি মাদরাসাভিত্তিক নেতৃত্বের বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় জনপরিসরে আলোচিত ও প্রভাবশালী আরেক নাম মুফতি গিয়াস উদ্দিন আত-তাহেরী। বিজয়নগরের বাসিন্দা এ ইসলামী বক্তা তার ওয়াজের ধরন ও বক্তব্যের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত। তার ওয়াজের বিভিন্ন অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে; একই সঙ্গে তাকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিজয়নগরে তাকে গ্রেফতারের একটি প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে অনুসারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন সময়ে তাহেরীর ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করেছে।

তবে ধর্মীয় পরিসরের এ পরিবর্তন ও বিভিন্ন সময়ের উত্তেজনাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন না স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। তাদের মতে, গান-বাজনাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রবণতা জেলায় খুব বেশি পুরনো নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার একজন সংস্কৃতিকর্মী বলেন, আশির দশক পর্যন্ত এ জেলায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ছিল। মানুষ নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করত, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও চলত বাধাহীনভাবে। ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চর্চা তখন ছিল না। তার মতে, ১৯৮৭ সালের পর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও একটি গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এর পর থেকেই এ ধরনের ঘটনা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন সাহিত্য একাডেমির সভাপতি জয়দুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এসব নিয়ে অনেক কথা বলেছি, কিন্তু কিছুই বদলায়নি। আমরা এখন শুধু এ আশায় আছি যে সব ঘটনার বিচার হবে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।’

শুধু পুলিশ লাইনসের ঘটনাই নয়, এর আগে গত ৩০ মে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীও বন্ধ করে দেয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি জেলা শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আয়োজন করেছিল। তবে প্রদর্শনী বন্ধের দাবিতে জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্যরা ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনীর অনুমতি বাতিল করে। পরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কসবা উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের মাঠে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আয়োজন করা হলেও প্রশাসন সেটি বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।

এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সে সময় তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতাঙ্গন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জেলায় একটি সিনেমা হলও নেই; কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা কারা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায় এবং বিশ্বের কাছে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চায়, তারাই ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে।

একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ছিল ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে উৎসবের উপলক্ষ। তবে গত দুই বছর নৌকাবাইচ বন্ধ ছিল। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর তিতাস নদীতে আবারো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। তবে এবারের নৌকাবাইচে প্রতিযোগিতা দেখতে আসা তরুণদের নৌকায় সাউন্ড সিস্টেম বাজানো ও নাচের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, নৌকাবাইচ দেখতে আসা তরুণদের অনেকে নৌকায় উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে নাচানাচি করেন। এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে কেউ কেউ পানিতে পড়ে মারা গেছেন। এসব বিষয় বিবেচনা করে নৌকাবাইচ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিছু সাংস্কৃতিক তৎপরতায় বাধা সৃষ্টির বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। এসব ক্ষেত্রে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক ও তাদের অধিকারের পক্ষে থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জোনায়েদ সাকি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনযাপন, আচার-আচরণ ও সামগ্রিক অনুশীলন। সমাজ ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ পুরো দেশে যুগ যুগ ধরে এ ধারাবাহিক চর্চা চলে আসছে। মানবিকতার বিকাশে ভবিষ্যতেও এ চর্চা অব্যাহত থাকবে—এটাই সর্বস্তরের জনগণের প্রত্যাশা। বল প্রয়োগ করে কারো অধিকার হরণ করার সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার কিংবা স্বাভাবিক চর্চায় হস্তক্ষেপ করলে সরকার নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক ও তাদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবে।’

জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম ধর্মীয় সংঘাতের সূচনা হয় আহমদিয়া মতবাদকে কেন্দ্র করে। জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আহমদিয়া জামাত প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সালে। ১৯৬৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একটি সম্মেলনে হামলা হয়। এতে দুজন মারা যান। নব্বইয়ের দশক থেকে শুধু ধর্মীয় মতবাদ নয়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নারীদের বিভিন্ন আয়োজনেও হামলা শুরু হয়। এর মধ্যে ১৯৯৮ সালে প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের বিজয় মেলায় হামলা এবং ২০১৬ ও ২০২১ সালে আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে হামলার ঘটনা দেশজুড়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ১৯৯৮ সালের ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বর বিজয় মেলার আয়োজন করে। ওই আয়োজনের বিভিন্ন স্লোগান নিয়ে আপত্তি জানান স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা। ৭ ডিসেম্বর মেলাটি ভেঙে দেয়ার জন্য হামলা চালানো হয়।

সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে (ওস্তাদ আলাউদ্দিন একাডেমি বা স্মৃতি জাদুঘর) দুই দফায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যুর খবরকে কেন্দ্র করে প্রথম হামলাটি ঘটে। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে নতুন করে নির্মিত সংগীতাঙ্গনে আবারো হামলা হয়। এছাড়া ২০১৬ ও ২০২১ সালে হামলার শিকার হয় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগারও।

জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিস্থিতি। বৃহস্পতিবার সংসদে জেলায় সিনেমা হল না থাকা, দুই বছর ধরে নৌকাবাইচ বন্ধ থাকা এবং কনসার্ট বন্ধের বিষয়গুলো তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এর আগেও বিষয়টি নিয়ে সংসদে কথা বলেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-আশুগঞ্জ এবং বিজয়নগর উপজেলার কিছু অংশে তরুণ সমাজকে ধর্মীয় উগ্রবাদ, অপপ্রচার ও সামাজিক বিভাজন থেকে দূরে রেখে ইসলামের প্রকৃত শান্তির বাণী ও নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে স্থানীয় মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’

তবে এসব ঘটনায় সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা বড় নির্ণায়ক বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় অনুভূতি অত্যন্ত গভীর। সরকার যখন নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না, তখনই মানুষ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নামে। তাই প্রকাশ্যে যেন মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে, তা নিশ্চিত করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের আবেগের ভিন্নতা বুঝে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিচালনা করা সরকারের দায়িত্ব।’

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনায় ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের দাবি, এসব ঘটনায় মাদরাসা শিক্ষার্থী ও তৌহিদী জনতাকে ‘ফ্রেমিং’ করা হচ্ছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদরাসা বা শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিষয়ে কোনো অভিযোগ কিংবা আপত্তি করা হয়নি। তারা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাগোয়া জায়গায় রাত ১২টায় উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টিকে এখন এভাবে ফ্রেমিং করা হচ্ছে যে মাদরাসা শিক্ষার্থী বা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সাংস্কৃতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সমাজে আবহমানকালের ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে। সেখানে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো দ্বিমত বা আপত্তি থাকলেও সরাসরি প্রতিবাদের পথ বেছে নেয়াকে আমরা সমীচীন মনে করি না। কোনো বিষয় যখন আমাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো, রীতিনীতি ও আবহমান সামাজিক অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে চলে যায়, কেবল তখনই তৌহিদী তথা ইসলামী জনতা তার প্রতিবাদ জানায়। তবে সেটিও সহিংসতার মাধ্যমে নয়। এর আগ পর্যন্ত মূলত দাওয়াত দেয়া বা এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।’

আরও