ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে খুলনায়। মাঝরাত থেকেই অনবরত বৃষ্টির
পাশাপাশি বাড়ছে বাতাসের গতিবেগ। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীর পানি এবং ক্রমান্বয়ে বাতাসের
গতিবেগ বাড়তে থাকায় আতঙ্কে রয়েছেন উপকূলীয় এলাকার মানুষ।
ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস হলেই যে এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, খুলনার
কয়রা তার মধ্যে অন্যতম। খুলনা জেলাশহর থেকে সড়কপথে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে এ জনপদ। এর
আগে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আইলায় সর্বস্ব হারানো এখানকার অনেকেই এখনো খুঁজে ফিরছেন স্থায়ী
নিবাস। আবার অনেকেই বেড়িবাঁধের পারগুলোতে অস্থায়ী আবাস তৈরি করে থাকছেন। এরই মধ্যে
সিত্রাং নতুন আতঙ্ক নিয়ে এসেছে তাদের জীবনে।
কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম শফিকুল ইসলাম বলেন, ঝড়ের চেয়ে আমাদের সবচেয়ে
বড় ভয় বেড়িবাঁধ। আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ কোনোরকমে টিকে আছে। নদীর পানি বাড়লেই
বিভিন্ন অংশে ভাঙন তৈরি হয়।সরকার নতুন করে এখানে টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ
দিলেও কাজ শুরু হয়নি।
শফিকুল জানান, হরিণখোলা ও গাতিরঘেরীর বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়ায় স্থানীয়দের নিয়ে
বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। উপজেলার হোগলা, দোশহালিয়া, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, ঘাটাখালী,
গাববুনিয়ার, আংটিহারা, ৪ নং কয়রা সুতির গেট ও মঠবাড়ির পবনা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়
রয়েছে।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, টেকসই বেড়িবাঁধ
নির্মাণের দাবি আমাদের বহুদিনের। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকেই এ দাবিতে আমরা সোচ্চার ছিলাম।
কিন্তু বেড়িবাঁধ নির্মাণের আশ্বাসেই পার হয়েছে এক যুগ।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, চারপাশে নদীবেষ্ঠিত গাবুরাকে
ঘিরে থাকা বাঁধ আইলার পর থেকে বেশ নিচু হয়ে আছে। ইয়াস ও আম্পানের পর থেকে বড়গাবুরা,
হরিশখালীসহ কয়েকটি অংশের বাঁধও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হলেও তার কাজ এখনও শুরু
হয়নি। ফলে ইউনিয়নের ৪০ হাজারের বেশি মানুষ আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় আতঙ্কিত
হয়ে পড়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় বেড়িবাঁধ
রয়েছে মোট ১ হাজার ৯১০ কিলোমিটার। ষাটের দশকে মাটি দিয়ে তৈরি এই বেড়িবাঁধ ছিল ১৪ ফুট
উঁচু ও ১৪ ফুট চওড়া। এখন এই ২৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের উচ্চতা ও চওড়ার অর্ধেকও অবশিষ্ট
নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের দৈর্ঘ্য আরো বেশি।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ঘূর্ণিঝড়
সিত্রাংয়ের প্রভাবে জোয়ারের পানির উচ্চতা এবং চাপে অনেক স্থানের দুর্বল বাধ ভেঙে যাওয়ার
শঙ্কা রয়েছে। তবে যেকোনো দুর্ঘটনা মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।
খুলনার জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের
বিশেষ করে কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
ওইসব উপজেলায় চলছে মাইকিং। যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার জন্য
নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। জেলার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫০ জনের জন্য ৪০৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত
রাখা হয়েছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং
এখন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে।
ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছে।
সকাল থেকেই খুলনা ও আশপাশের জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে
দুপুর ১২টা পর্যন্ত খুলনায় রেকর্ড করা হয়েছে ৬৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত। বর্তমানে
খুলনায় ১৫-২০ কিলোমিটার গতিবেগে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে বাতাসের গতিবেগ আরও বাড়ব
বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
ঘূর্ণিঝড় আইলা, সিডর ও আম্পানের পরে আবারও সিত্রাংয়ের আঘাতের খবরে জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কায় রীতিমত আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন উপকূলীবাসী।ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় উপকূলীয় এলাকাগুলোর আমন ধানের খেত তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বৃষ্টি দেরিতে হওয়ায় এবার আমন ধানও লাগানো হয়েছে দেরিতে। এ দফায় বৃষ্টিপাত আরও বাড়লে এবং দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাবে।