বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ

মধুমতি-চিত্রাসহ নড়াইলের চার নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে আড়াই গুণ লবণাক্ততা

ফসল উৎপাদনে কৃষকের খরচ বেড়েছে তিন গুণ

উপকূলীয় এলাকা না হলেও নড়াইলের নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে প্রতিনিয়তই। নদীগুলোর বেশ কয়েকটি পয়েন্টের পানি ধীরে ধীরে হয়ে পড়েছে সেচের অনুপযোগী।

উপকূলীয় এলাকা না হলেও নড়াইলের নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে প্রতিনিয়তই। নদীগুলোর বেশ কয়েকটি পয়েন্টের পানি ধীরে ধীরে হয়ে পড়েছে সেচের অনুপযোগী। ফলে নদী ও খালের পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করতে না পেরে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন কৃষক। সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বোরো আবাদে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। অনেক স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও বেশ নেমে গেছে।

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ। ধরিত্রীকে বাঁচানোর জন্য করণীয় সম্পর্কে সচেতন করতে আজ দিবসটি পালন করা হয়। জলবায়ুজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতিনিয়তই বিষিয়ে উঠছে এ দেশের কৃষি-প্রকৃতি ও প্রাণ। এমন পরিস্থিতিতেই দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। এবারের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের শক্তি, আমাদের পৃথিবী’।

৯৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট জেলা নড়াইল। প্রায় আট লাখ মানুষের বসবাস। বিল ও ঘেরবেষ্টিত এ জেলার মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস কৃষিকাজ ও মৎস্য চাষ। কিন্তু ভূ-উপরিস্থ পানিতে লবণের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি হওয়ায় কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। এরই মধ্যে পাঁচ হাজার একর তিন ফসলি জমি এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে বলে জানা গেছে।

নড়াইল সদর থানার বাঁশভিটা গ্রামের কৃষক পরাগ বরণ বিশ্বাস। এ বছর তিনি তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। এক দশক আগে নদী ও খালের পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিলেও কয়েক বছর ধরে আর পারছেন না। কেননা খালের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় তা এখন সেচের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। এতে ফসল উৎপাদনের খরচও বেড়ে গেছে প্রায় তিনগুণ। খাল থেকে পানি নিয়ে চাষ করতে তিন বিঘা জমিতে সেচ খরচ হতো ৭-৮ হাজার টাকা। এখন সেচ খরচ হিসেবে তাকে গুনতে হচ্ছে অন্তত ২১ হাজার টাকা।

নড়াইলে নদ-নদীতে লবণাক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের নড়াইল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রতিবেদনেও। তাতে বলা হয়েছে, নড়াইল জেলার মধুমতি, আফরা, নবগঙ্গা ও চিত্রা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে সেচ উপযোগিতা হারিয়েছে। নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবে লবণাক্ততা বেড়েছে জেলার খালগুলোয়ও। সেচের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বিভিন্ন খাল, বিল ও জলাশয়ের পানি। ফলে বিপাকে পড়েছেন সব প্রান্তিক কৃষক।

যশোর মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউ থেকে জানা গেছে, নড়াইলে ২০০০ সালের একটি সার্ভে রিপোর্টে পানিতে প্রথম লবণাক্ততা ধরা পড়ে। তখন এর এরিয়া ছিল ১৬ হাজার হেক্টর জমি। পরে ২০০৯ সালের সার্ভেতে প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততা ধরা পড়ে। এরপর গত বছর একটি সার্ভে করা হয়, কিন্তু তার ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি। কৃষিজমিতে সেচ উপযোগী পানিতে লবণের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় ০.৭৫ ডিএস/মিটার। পানিতে লবণের মাত্রা এর বেশি হলে সেচ অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ১.৭৫ ডিএস/মিটার পর্যন্ত দেখা গেছে।

এ বিষয়ে যশোর মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মোতাসীম আহমেদ বলেন, ‘নড়াইলের মধুমতি নদীর কালনাঘাট, নবগঙ্গা নদীর বারইপাড়া, চিত্রা নদীর আওড়িয়া এবং আফরা নদীর তুলারামপুর পর্যন্ত এর পানি বছরের একটা সময় পর্যন্ত লবণাক্ত থাকে। নদীর পানি ও লবণাক্ততা প্রধানত উজান থেকে পানির প্রবাহ এবং উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। উজানে পানির প্রবাহ বেশি এবং অধিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত হলে লবণাক্ততা কমে যায়।’

উজানের পানি বাংলাদেশে ঢুকতে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে জোয়ারের পানি সহজেই সমুদ্রের কাছাকাছি জেলাগুলোয় ঢুকে যাচ্ছে। উজানের পানি যদি নির্বিঘ্নে ঢুকতে পারত তাহলে স্রোতের সঙ্গে সমুদ্রের লবণ পানি চলে যেত। কিন্তু সে পথ ধীরে দীরে সংকুচিত হওয়ায় ভূ-উপরিস্থ পানিতে লবণের উপস্থিতি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিনুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ফারাক্কা দিয়ে পানিপ্রবাহ যত বেশি থাকবে, এ অঞ্চলের নদী ও খালগুলোর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ তত কম থাকবে। ফারাক্কার পানিপ্রবাহ কম থাকলে নদী ও খালের পানিতে লবণের মাত্রা বেড়ে যায়। বৃষ্টিপাত যত বেশি হবে পানিতে লবণের মাত্রা তত কম হবে। যে বছর বৃষ্টি কম হয় সেই বছর লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়া দেশের খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও নদীতে চর জাগার ফলে এখন আর আগের মতো পানি নির্বিঘ্নে যেতে পারছে না। ফলে ধীরে ধীরে লবণাক্ততা আরো ভেতরের দিকে ঢুকছে। এটা সামনে আরো চিন্তার কারণ হবে আমাদের জন্য।’

যেসব জমিতে লবণ পানি প্রবেশ করে, সেগুলো ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং সার খরচও বেশি লাগে। ফলে সেচ খরচ ও সার খরচ বেশি হওয়ায় বোরো আবাদে উৎপাদন খরচ বেড়েছে কৃষকদের। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নড়াইল সদর ও কালিয়া উপজেলার হাজার হাজার কৃষক।

সদরের মুলিয়া এলাকার প্রান্তিক কৃষক রতন ঘোষ বলেন, ‘লবণ পানি প্রবেশ করায় মুলিয়া, বাহিরগ্রাম, আকদিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকার কৃষকেরা জমিতে বছরে একটি ফসলের বেশি আবাদ করতে পারছেন না। অথচ এসব এলাকায় কয়েক বছর আগেও বছরে তিনটি করে ফসল ফলাতেন কৃষক।’

কালিয়া উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের কৃষক মো. পিকুল শেখ বলেন, ‘জমিতে যখন সামান্য লবণ পানি প্রবেশ করে তখন জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করতে হয়। আর যখন পানিতে লবণের মাত্রা বেশি থাকে তখন খেতের ফসল সব নষ্ট হয়ে যায়।’

জানা গেছে, জমিতে লবণ পানি প্রবেশ করায় নড়াইল সদর ও কালিয়া অঞ্চলে অন্তত পাঁচ হাজার একর তিন ফসলি জমি এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রন্ত হচ্ছেন এ জনপদের হাজারো প্রান্তিক কৃষক। ব্যাহত হচ্ছে বোরোসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বেশ কয়েক বছর ধরে নড়াইলের নদী ও বিভিন্ন খালে মার্চ থেকে শুরু করে জুন পর্যন্ত লবণ পানি প্রবেশ করায় নড়াইল সদর ও কালিয়া উপজেলার কৃষক নদী ও খালের পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। প্রতি বছর পানিতে লবণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছ। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

নড়াইল বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) মো. মেশকাত আলী বলেন, ‘কৃষক নদী ও খালের পানি ব্যবহার করতে না পেরে বাধ্য হয়ে গ্রাউন্ড ওয়াটারের ওপর বেশি নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এতে কৃষকদের খেতের বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। গ্রাউন্ড ওয়াটারের ওপর এত নির্ভরশীল হলে আগামী দিনে কৃষক আরো ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।’

নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘জেলার নদী ও খালগুলো পুনঃখনন করে জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে পারলে কৃষক নদী ও খালের পানি ব্যবহার করতে পারবেন। তখন সেচ খরচ অনেক কমে যাবে। যেসব এরিয়ায় লবণাক্ততার মাত্রা বেশি সেই এলাকার কৃষকদের গম, সূর্যমুখী, ভুট্টাসহ বিভিন্ন লবণসহিষ্ণু ফসল চাষাবাদের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’

আরও