দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগের প্রধান রুট দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুট। যানবাহন পারাপারের জন্য পাটুরিয়া অংশে পাঁচটি ফেরিঘাট রয়েছে। এর মধ্যে দুটি অপারেট করছে না বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। চলতি বছর পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে বাকি তিন ঘাটের বেশির ভাগই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি পুরোপুরি সচল থাকলেও দুটি দিয়ে আংশিকভাবে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। ভোগান্তি নিরসনে পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় নদী শাসনে ২০১৯ সালে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ওই সময় কিছু কাজও করা হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের দিকে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় হুমকির মুখে পড়েছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুট।
বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রশাসনিক জটিলতায় এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, নদী শাসনের কাজ পাউবো করবে। আর পাউবো বলছে, ফেরিঘাট এলাকা রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর।
ঘাট এলাকার বাসিন্দারা জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের রাজধানীসহ সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। প্রতিদিন এ পথে দেড়-দুই হাজার যানবাহন পারাপার হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর চাপ কিছুটা কমলেও নৌপথটির গুরুত্ব কমেনি। তবে বর্ষা এলেই পদ্মার স্রোত আর ভাঙনে একের পর এক সংকটে পড়ছে ফেরিঘাটগুলো। বিআইডব্লিউটিএ আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে এ ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে ঠেকানো যেত।
ফেরি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘাট ক্ষতির মুখে পড়ছে। তার পরও স্বল্প পরিসরে ফেরি সার্ভিস চালু রেখেছি। তীব্র স্রোত ও ভাঙনের মধ্যেও ফেরি সচল রাখা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘাট এলাকায় নিয়মিত মেরামতের কাজ চলছে। তবে স্থায়ী সমাধান না হলে পাটুরিয়া ফেরিঘাট হুমকির মুখে পড়বে।’
২০০২ সালে আরিচা থেকে স্থানান্তর করে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাটগুলো নির্মাণ করা হয়। তখন থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ভরসাস্থল হয়ে ওঠে এ নৌপথ।
ঘাটসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল স্রোত আঘাত হানছে পাটুরিয়াঘাট এলাকায়। ভাঙন রোধে আগাম প্রস্তুতি নিতে ঘাটসংশ্লিষ্টরা বিআইডব্লিউটিএকে আগাম সতর্কবার্তা দেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। এরই মধ্যে ৫ আগস্ট বিকালে লঞ্চঘাটের একটি জেটি ভেঙে যায়। রাতে পুরো লঞ্চঘাট বিলীন হয়ে যায়। একইভাবে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে তিনটি ফেরিঘাট। ভাঙন রোধে ৭ আগস্ট বিআইডব্লিউটিএ ৪০০ জিও ব্যাগ লঞ্চঘাট এলাকায় ফেলে। কিন্তু তীব্র স্রোতে জিও ব্যাগগুলো নদীতে ভেসে গেছে। এরই মধ্যে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ফেরিঘাটের বেশির ভাগ অংশ ভেঙে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফেরির পন্টুন ও র্যাম। ৮ আগস্ট ৪ নম্বর ঘাটের অর্ধেক ভেঙে র্যাম্পসহ পন্টুন ভেসে যায়। পরে টাগ জাহাজ দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাটি থেকে র্যাম্পসহ পন্টুনটি উদ্ধার করে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ। পরে বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ ও পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে বিআইডব্লিউটিএ ঘাট রক্ষায় বড় ধরনের উদ্যোগ না নিয়ে ৭০০ জিও ব্যাগ ফেলে।
পাটুরিয়া ফেরিঘাট রক্ষা ও নদী শাসনের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর আরিচা নদীবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী নেপাল চন্দ্র দেবনাথ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাটুরিয়ায় এমন ভাঙন গত দুই দশকে হয়নি। স্রোতের কারণে প্রতিটি ঘাটই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা এখন ঘাট রক্ষায় নিয়মিত জিও ব্যাগ ফেলছি। মূলত পাউবো নদী শাসনের কাজ করে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পাউবো কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত এলেই বড় কাজগুলো শুরু করা হবে।’
তবে মানিকগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেরিঘাট রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর। ঘাট এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু কারিগরি সহযোগিতা করে।’
যানবাহনের চালকরা জানান, নদী পার হতে প্রতিদিনই ঘাট এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। যাত্রীরা পড়ছেন সীমাহীন দুর্ভোগে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘাট রক্ষায় কাজ শুরু করলে এ বিড়ম্বনা হতো না।
সার্বিক বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী মো. মহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাকৃতিকভাবে এখানে ভাঙন শুরু হয়েছে। বৈজ্ঞানিকভাবে নদীর মাঝামাঝি দিয়ে কোনো চ্যানেল তৈরি করে স্রোতের গতি পরিবর্তন করে দিলে হয়তো পাড়ে ভাঙন হবে না।’
তিনি বলেন, ‘পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় নদী শাসনে ২০১৯ সালে বড় একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। ওই সময় কিছু কাজও করা হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের দিকে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন নতুন করে পাউবোকে সম্পৃক্ত করে বড় ধরনের প্রকল্প নেয়ার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত হলে ঘাট রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’