র্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির মুখেই গতকাল জাতীয় সংসদে দীর্ঘ আলোচনা ও দফাওয়ারি বিবেচনার পর ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। র্যারের জনবল, সম্পদ, নথিপত্র, স্থাপনা, তহবিল ও দায়দায়িত্ব নতুন ইউনিটে হস্তান্তরের বিধান থাকায় বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, কার্যত একই বাহিনীকে নতুন নামে রাখা হচ্ছে। এসআরবি বিল পাসের মাধ্যমে নতুন নামে পুরনো বাহিনীর কাঠামো ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরাও।
এছাড়া গতকাল ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালের পুরনো অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হলো। নতুন এ আইনে প্রথমবারের মতো এপিবিএনকে অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার স্পষ্ট ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব ও পরিধিও ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল সংসদে এসআরবি বিলটি আরো যাচাই-বাছাই এবং অংশীজনদের মতামত নেয়ার দাবি জানান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানো এবং বাছাই কমিটিতে পাঠানোর বিরোধী দলের প্রস্তাব নাকচ হয়। এছাড়া বিলের প্রস্তাবনা ও ২৪ ধারায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের আনা দুটি সংশোধনীও কণ্ঠভোটে নাকচ করে সংসদ। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন পায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, র্যাব বিলুপ্ত করেই নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হচ্ছে।র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সম্পর্ক নেই।
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, এসআরবি বিল পাসের মাধ্যমে নতুন নামে পুরনো বাহিনীর কাঠামো ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘র্যাব থাকছে না, কিন্তু এর জায়গায় এসআরবি গঠন করা হচ্ছে। ফলে নতুন নামে পুরনো বাহিনীর কাঠামো ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা যেতে পারে, যাদের আধুনিক অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশের। এ কাজে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য যুক্ত করে যেমন র্যাব তৈরি করা হয়েছিল, ঠিক তেমনই এসআরবি গঠন করা হচ্ছে। এতে একই কাঠামো থাকছে। ফলে একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে—এ আশঙ্কা করা অমূলক নয়। কারণ মৌলিক কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।’
এসআরবি বিলে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতায় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্ধারিতসংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল ও কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে ইউনিটটি গঠন করা হবে। ইউনিটের কর্মকর্তা, আর্মড পারসোনেল ও কর্মচারীদের পদবিন্যাস, নিয়োগ পদ্ধতি ও চাকরির শর্ত বিধি দিয়ে নির্ধারণ করা হবে। এসআরবির আলাদা পতাকা, প্রতীক ও নির্দিষ্ট পোশাক থাকবে। পুলিশে কর্মরত অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এসআরবির মহাপরিচালক হবেন।
বিলে র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও দলিল এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। নতুন আইনের বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান বিধিমালার অধীনে র্যাবের বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আদালতের চলমান কার্যধারাও বহাল থাকবে।
এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেফতার ও জব্দের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ কমিটির সভাপতি হবেন।
জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, ‘র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও খুনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।’ এমন একটি বাহিনীর জায়গায় নতুন ইউনিট গঠনের আইন চার কার্যদিবসের মধ্যে পাসের জন্য আনার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘র্যাবের প্রতি আমাদের আতঙ্ক আছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং গোটা বাংলাদেশের গুম ও খুনের একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ ধরনের একটা বিল কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে পাস করার জন্য এখানে নিয়ে আসা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ ভুক্তভোগী, ফৌজদারি আইনজীবী, মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অন্য অংশীজনদের সঙ্গে আরো আলোচনার দাবি জানান নুরুল ইসলাম।
সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীকে র্যাব সদস্যদের তুলে নেয়ার চেষ্টার অভিযোগ সংসদে তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা দেখিয়েছে, বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত সদস্যদের আচরণে পরিবর্তন আসেনি। তারা আগে যেমন ছিলেন, এখনো তেমনই আছেন। সেই একই বাহিনীর লোকেরা একই জায়গায় হস্তান্তর হচ্ছেন। তাদের স্থাপনা যা আছে তা-ই থাকবে, লজিস্টিক যা আছে তা-ই থাকবে, ম্যানপাওয়ার যা আছে তা-ই থাকবে। কেন এমন একটি বাহিনীর প্রয়োজন, তার যথার্থতা আরো বেশি পরিষ্কার হয়ে আসুক।’
বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্ত করা সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। বিলটি পাসে যত বিলম্ব হবে, র্যাবের অস্তিত্ব ততদিন থাকবে বলেও যুক্তি দেন তিনি।’ বিলটি নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি, বিরোধী দলের এমন বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিলটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন মতামত এসেছে। সংসদে উত্থাপনের পর স্থায়ী কমিটিতেও এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’ বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো নিয়েও সংসদে বিস্তারিত জবাব দেন তিনি। বিলের ২৪ ধারায় থাকা অভিযোগ প্রতিকার কমিটি নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ কমিটি কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত করবে না। ইউনিটের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে বাইরের কারো অভিযোগ অথবা সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাহিনীর কোনো সদস্য ফৌজদারি অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন।
এসআরবি বিল পাসের পর ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ বিবেচনায় নেয় সংসদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্সের একটি ধারা সংশোধন করেই পরে র্যাব গঠন করা হয়েছিল। এসআরবি আইন করার পরও পুরনো আইনে র্যাবের সেই আইনি ভিত্তি থেকে গেলে বাহিনীটির অস্তিত্ব আইনে থেকে যাবে।’ সে কারণেই পুরনো অর্ডিন্যান্স রহিত করে নতুন এপিবিএন আইন করা হচ্ছে বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
এ আইনের ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি এপিবিএন এখন থেকে সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, মানব পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, গুম এবং জমি দখলের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের নির্ধারিত ভিআইপিদের নিরাপত্তা বিধান এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বও তাদের হাতে থাকছে।
স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন, মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন ও এয়ারপোর্ট ব্যাটালিয়নের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো এখন থেকে এপিবিএনের একক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে। আইনে প্রথমবারের মতো এপিবিএন কর্মকর্তাদের ফৌজদারি অপরাধের তদন্তভার দেয়া হয়েছে। ন্যূনতম সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশনস অনুসরণ করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তদন্তের স্বার্থে ব্যাটালিয়নকে নিজস্ব ডিটেনশন সেল (আটক কেন্দ্র), ব্যারাক এবং জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের আইনি অনুমতি দেয়া হয়েছে। উদ্ভাবন ও কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে এপিবিএন সদর দপ্তরে একটি সাইবার সেল এবং গবেষণা ইউনিটও গড়ে তোলা হবে।