রাজধানীর ৬০ ফিট এলাকার বাসিন্দা ফারজানা নাজনীনের ১ অক্টোবর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ওষুধের পাশাপাশি চিকিৎসক তাকে শিরায় দেয়া স্যালাইন নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু স্যালাইন কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তার স্বামী সারওয়ার। তিনি জানান, ৬০ ফিট এলাকার ১০-১২টি ফার্মেসিতে ঘুরেও মাত্র একটি দোকানে স্যালাইন পাওয়া গেছে। সরজমিনেও ওই এলাকার একাধিক ফার্মেসিতে স্যালাইন সংকট দেখা গেছে। শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও একই ধরনের সংকট চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত শিরায় দেয়া স্যালাইন সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দশমিক ৯ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড বা নরমাল স্যালাইন অনেক হাসপাতাল ও খুচরা ফার্মেসিতে মিলছে না। রোগীর স্বজনদের একাধিক ফার্মেসিতে ঘুরতে হচ্ছে। আবার কোথাও সরবরাহ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় ওরাল স্যালাইনেরও সংকট দেখা দিয়েছে।
৬০ ফিটের দক্ষিণ পীরেরবাগে অবস্থিত আনিফা ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী গোলাম আযম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সাধারণত অপসো ফার্মা ও বেক্সিমকো ফার্মার দশমিক ৯ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড আইভি ইনফিউশন মজুদ রাখি। চিকিৎসকরাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ দুই কোম্পানির স্যালাইনই ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেন। তবে ১৫-২০ দিন ধরে দোকানে এসব স্যালাইন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, পণ্যের সংকট রয়েছে। এ কারণে আপাতত হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসিগুলোতে সরবরাহ দেয়া হলেও অন্যান্য খুচরা ফার্মেসিতে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বেক্সিমকো ফার্মার ড্রাগ সেফটি অ্যান্ড ফার্মাকোভিজিল্যান্স বিভাগ কর্তৃপক্ষ বণিক বার্তাকে জানায়, বেশ কিছুদিন সেলোরাইড উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে ৫০০ মিলিলিটারের সেলোরাইড সরবরাহ আবার চালু হয়েছে এবং দ্রুতই তা ফার্মেসিগুলোতে পৌঁছানো হবে। আর এক লিটারের সেলোরাইড চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংকট মোকাবেলায় সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর শারীরিক অবস্থা, পানি পান করার সক্ষমতা, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, হেমাটোক্রিটসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক আইভি ফ্লুইড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে গুরুতর ডেঙ্গু বা সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে আইভি ফ্লুইডের প্রয়োজন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) নির্দেশনায় এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে আইসোটোনিক ক্রিস্টালয়েড হিসেবে শিরায় দেয়া নরমাল স্যালাইন বা রিঙ্গারস ল্যাকটেট ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায়ও আইভি ফ্লুইড হিসেবে দশমিক ৯ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড ও রিঙ্গারস ল্যাকটেটের মতো ব্যালান্সড ক্রিস্টালয়েডের ব্যবহার মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, জ্বর চলে গেলেই ডেঙ্গু রোগী ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু জ্বর না থাকলেও রোগী ঝুঁকিমুক্ত নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার পর শরীর থেকে প্রয়োজনীয় তরল বেরিয়ে গিয়ে রক্তচাপ কমতে শুরু করে। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা প্রয়োজন অনুযায়ী স্যালাইন দিয়ে থাকেন।’
দেশের অন্যতম বৃহৎ ফার্মেসি লার্জ ফার্মা লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মিরপুর শাখার ম্যানেজার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরেই এ স্যালাইনের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে শাখায় এ জেনেরিকের অপসো ফার্মার ৫০০ মিলিলিটারের স্যালাইন রয়েছে। তবে সেটিও অনেক আগে মজুদ করা হয়েছিল। আশপাশের অন্যান্য ফার্মেসিতে এ স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না।’
সরজমিনে মিরপুরের কেয়ার অ্যান্ড ফেয়ার ফার্মা, মিরপুর ফার্মা ও মনোয়ারা ফার্মেসিতেও একই ধরনের সংকট দেখা গেছে। আগারগাঁওয়ের ভূইয়া ফার্মাসহ আরো কয়েকটি ফার্মেসিতেও শিরায় দেয়া স্যালাইন সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে মহাখালী, কল্যাণপুর, শ্যামলী, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকার বিভিন্ন ফার্মেসিতেও কয়েকদিন ধরে স্যালাইনের ঘাটতি রয়েছে।
শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলাতেও শিরায় দেয়া স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে। ফেনীর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ভবনে অবস্থিত হাসান ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বেক্সিমকোর এ স্যালাইনের সংকট রয়েছে। আপাতত আমরা অন্যান্য কোম্পানির স্যালাইন দিয়েই চাহিদা মেটাচ্ছি।’
ফেনীর নিউ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী ইলিয়াস সুমনও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, শুধু সেলোরাইড নয়, বাজারে প্রায় সব ধরনের স্যালাইনেরই ঘাটতি চলছে।
তবে মৌলভীবাজারের কিছু ফার্মেসিতে এখনো এ জেনেরিকের স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ফার্মেসির স্বত্বাধিকারীরা জানান, তারা ১৫-২০ দিন আগে এসব স্যালাইন মজুদ করেছিলেন। ওই অঞ্চলে তুলনামূলক ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকায় স্যালাইনের চাহিদাও কম। অন্যদিকে পপুলার ফার্মার মৌলভীবাজারের এক বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, দুই সপ্তাহ ধরে তাদের কোম্পানির এ স্যালাইনের নতুন সরবরাহ আসছে না। তবে সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণ সম্পর্কে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
স্যালাইনের এ সংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (৭ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৯৩৫ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪।
স্যালাইন সংকটের বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ডেঙ্গু চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় এবং বাজারে যেন ঘাটতি না পড়ে। বিষয়টি আমরা নিয়মিত তদারক করছি। কোনো এলাকায় সংকটের অভিযোগ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’