বিসিআইসির প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রমাণ নেই

মোট ঋণের ৫৭ শতাংশের কোনো নথিপত্র খুঁজে পায়নি নিরীক্ষক

বিসিআইসির বৈদেশিক ঋণ চুক্তির নথি নিরীক্ষার সময় পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব যাচাই ও আয়-ব্যয়ের হিসাবেও গুরুতর অসংগতি পেয়েছেন নিরীক্ষকরা

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন বিভিন্ন প্রকল্প ও কারখানায় বিভিন্ন সময়ে ঋণ হিসেবে দেয়া হয়েছে ৩২ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার হিসাব যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষকরা, যা সংস্থাটির মোট সম্পদের ৫৭ শতাংশ। নিরীক্ষার সময় পাওয়া যায়নি বিসিআইসির বৈদেশিক ঋণ চুক্তির নথিও। সংস্থাটির আর্থিক প্রতিবেদনে এমন একাধিক বিষয়ে গুরুতর আপত্তি তুলে মতামত দিয়েছেন নিরীক্ষকরা। অন্যদিকে প্রায় চার দশক আগের এসব নথির হদিস পেতে অনুসন্ধান চালানোর কথা জানিয়েছেন বিসিআইসির কর্মকর্তারা।

পাঁচ দশক আগে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সার, রসায়ন ও ভেষজ শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ কাগজ ও বোর্ড করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ট্যানারিজ করপোরেশনকে একীভূতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিসিআইসি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ৮৮টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যাত্রা শুরু করে সংস্থাটি। পরবর্তী সময়ে নিজস্ব উদ্যোগে ছয়টি নতুন কারখানা স্থাপন করে বিসিআইসি। পাশাপাশি অন্য সংস্থা থেকে আরো তিনটি কারখানা এর নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়। এতে সংস্থাটির অধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭টিতে।

সরকারের বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৫টি থেকেই পুঁজি প্রত্যাহার করা হয়। এর মধ্যে সাতটি কারখানা সাবেক মালিকদের কাছে এবং সাতটি প্রতিষ্ঠান হস্তান্তর করা হয় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কাছে। সরকারি সিদ্ধান্তে আরো পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সেগুলোর কর্মীদের পাওনা পরিশোধের মাধ্যমে অব্যাহতি দেয়া হয়। এছাড়া বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির আওতায় ২০০২ সাল থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

বর্তমানে বিসিআইসির অধীনে চালু কারখানার সংখ্যা ১১। এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া সার, একটি ডিএপি সার, একটি টিএসপি সার, একটি কাগজ, একটি সিমেন্ট, একটি গ্লাসশিট এবং একটি স্যানিটারিওয়্যার ও ইনসুলেটর কারখানা। সংস্থাটির উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই রাসায়নিক সার। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ইউরিয়া এবং ১০ শতাংশ অন্যান্য সার। এছাড়া যৌথ অংশীদারত্বে পরিচালিত ১০টি কারখানাও রয়েছে বিসিআইসির। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছর থেকে সারা দেশে কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণের দায়িত্বও সংস্থাটির ওপর ন্যস্ত করা হয়।

বিসিআইসির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করেছে মোল্লা কাদির ইউসুফ অ্যান্ড কোম্পানি এবং মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সংস্থাটির আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক গুরুতর আপত্তি তুলেছেন নিরীক্ষকরা। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে বিসিআইসির বিভিন্ন প্রকল্প ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৭০৯ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা-প্রমাণ পাননি তারা। এ অর্থ সংস্থাটির মোট সম্পদের ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। বিপরীতে মাত্র ৭ হাজার ৯১৯ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পেরেছে বিসিআইসি।

নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ঋণের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পড়ে রয়েছে। ঋণের বিপরীতে সুদ হিসাবভুক্ত করা হয়নি, এমনকি আইএফআরএস ৯ (আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান) অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঋণক্ষতির বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থানও রাখা হয়নি। ফলে বিপুল অংকের এ ঋণের প্রকৃত আদায়যোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একই ধরনের আপত্তি রয়েছে প্রকল্প ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিসিআইসির পাওনা ২ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা এবং বিলগ্নীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাওনা ৩৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকার হিসাব নিয়েও। বিলগ্নীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বর্তমানে চালু আছে কিনা, তা স্পষ্ট নয় বলে নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ। তা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা অর্থ আদায়যোগ্য হিসেবে আর্থিক বিবরণীতে দেখানো হয়েছে।

বিসিআইসির নিরীক্ষক মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পার্টনার মো. কামরুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঋণের তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমরা যেসব নথিপত্র চেয়েছিলাম, তারা সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও নথিপত্র আমাদের দেখাতে পারেনি।”ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরবরাহ করা তথ্যের বাইরে তাদের কাছে আর কিছু নেই। আমরা যা পেয়েছি, তার ভিত্তিতে নিরীক্ষা করেছি এবং যেসব বিষয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।’

ঋণের হিসাবের পাশাপাশি বিসিআইসির স্থায়ী সম্পদের হিসাবেও বড় ধরনের ঘাটতি পেয়েছেন নিরীক্ষকরা। ১২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি মূল্যের স্থায়ী সম্পদের বিপরীতে সম্পদ নিবন্ধন, শনাক্তকরণ ট্যাগ ও সমন্বয়-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এসব সম্পদের মালিকানা ও দখল নিশ্চিত করার কথা জানালেও সম্পদগুলোর অস্তিত্ব ও বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলেনি। আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস ৩৬ অনুযায়ী এসব সম্পদের মূল্যহ্রাস যাচাইয়ের প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেনি সংস্থাটি।

আয়ের হিসাবেও স্বচ্ছতার ঘাটতি চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষকরা। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিআইসির মোট আয়ের ৮০ দশমিক ৯৩ শতাংশ বা ১০৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এসেছে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ব্যবস্থাপনা চার্জ বাবদ। তবে এ আয়ের বিপরীতে সীমিত তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন নিরীক্ষকরা। অন্যদিকে ‘ব্যবস্থাপনা ব্যয় সমন্বয় হিসাব’ খাতে ৩৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা বাদ দেয়ায় সংস্থাটির আয়-ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, এ হিসাব পদ্ধতি আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস ১-এর পরিপন্থী। ফলে আর্থিক বিবরণীতে বিসিআইসির প্রকৃত লাভ বা ক্ষতির অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে না।

ঋণের নথি নিরীক্ষকদের কাছে উপস্থাপন করতে না পারার কারণ জানতে চাইলে বিসিআইসির হিসাব নিয়ন্ত্রক এবং কারিগরি ও প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এসএম সোহেল আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এগুলো মূলত বিভিন্ন কারখানার বিপরীতে নেয়া ঋণ। সরকার ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেয়া এসব ঋণের হিসাব আমাদের কাছে আছে। তবে প্রায় ৪০ বছর আগের কিছু ঋণের মূল চুক্তিপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি নিরীক্ষকদের দেখানো যায়নি। এসব নথি আমাদের ফাইন্যান্স বিভাগে সংরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময়ে কর্মকর্তা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে কিছু মূল নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা এখনো নথিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’

ঋণ আদায় না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে এসএম সোহেল আহাম্মদ বলেন, ‘কয়েকটি কারখানা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকটে বন্ধ বা স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন ও আয় না থাকলে সেসব কারখানা থেকে ঋণের অর্থ আদায় করাও কঠিন। তবে সব কারখানার পরিস্থিতি এক নয়। ঘোড়াশাল-পলাশ প্রকল্প সচল ও সেখানে আয় হচ্ছে, তাই ওই প্রকল্পের ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে। অন্যদিকে আশুগঞ্জ ও যমুনার মতো পুরনো কারখানায় গ্যাস সংকট ও যন্ত্রপাতিজনিত সমস্যায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’ উৎপাদন স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংস্থাটির সরকারি তহবিলের হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ হিসাবের তুলনায় সরকারি শেয়ার মূলধন তহবিল ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা কম এবং সরকারি ইকুইটি তহবিল ১৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে, যা যথাযথ সমন্বয়ের অভাব নির্দেশ করে। এছাড়া সরকারি মূলধন অনুদানসংশ্লিষ্ট সম্পদের আয়ুষ্কাল অনুযায়ী পদ্ধতিগতভাবে আয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। অনুদান চুক্তি ও বরাদ্দের নথিও নিরীক্ষকদের দেয়া হয়নি। ‘সরকারি কোয়াসি তহবিল’ নামের একটি হিসাবের ব্যবহার ও সম্ভাব্য পরিশোধের শর্তসংক্রান্ত চুক্তি না পাওয়ায় এর প্রকৃতিও যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষকরা।

দায়ের ক্ষেত্রে একই ধরনের অস্বচ্ছতা দেখা গেছে। বিসিআইসির বৈদেশিক ঋণ ২৮ হাজার ৩ কোটি টাকা। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সরকারি ঋণ ৪ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, কাফকোর মূল্য পার্থক্য হিসাব ১৯৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন উৎস থেকে নেয়া ঋণ ১২৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এসব দায়ের বিপরীতে ঋণ চুক্তি, পরিশোধসূচি, ঋণদাতার স্থিতি নিশ্চিতকরণ বা হিসাব পুনর্মিলনের নথি পাওয়া যায়নি। নিরীক্ষকের মতামতে বলা হয়েছে, অনেক ঋণ ও দায়ের স্থিতি বছরের পর বছর অপরিবর্তিত। কিছু ক্ষেত্রে সুদও ধারাবাহিকভাবে হিসাবভুক্ত হয়নি। এগুলোর পাশাপাশি ‘বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ’ অংশে আরো বেশকিছু বিষয়ে হিসাবমান ও আইন অনুসরণ না করার কথা তুলে ধরেছেন নিরীক্ষকরা। তাদের মতে, এসব ঘাটতির কারণে বিসিআইসির আর্থিক বিবরণী থেকে সংস্থাটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, সম্পদের মূল্য, ঋণ আদায়যোগ্যতা ও দায়ের পরিমাণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন।

নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। সম্প্রতি একটি সমন্বয় সভায় বেশ কয়েকটি নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে জানতে পেরেছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে। কীভাবে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে, তা যাচাই করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতির নাজুক চিত্র উঠে এসেছে অর্থ বিভাগের একাধিক প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টিরই নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। অর্থাৎ পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া প্রতি দুই প্রতিষ্ঠানের প্রায় একটির নিজস্ব আয় নেই। অন্যদিকে বাকি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত ও আর্থিক ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে এসব প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের বেশকিছু বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর সরকারের জাতীয় বাজেট থেকে ভর্তুকি, অনুদান বা ঋণের মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়, যা সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নেয়া ঋণের বিপরীতে সরকার ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা সরাসরি সরকারের ঘাড়ে চাপে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় অদৃশ্য ঝুঁকি।

শুধু বিসিআইসি নয়, সব সরকারি করপোরেশনের ক্ষেত্রেই একই চিত্র উল্লেখ করে সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করপোরেশনগুলোর কার্যক্রমে জবাবদিহির ঘাটতি আছে। প্রতিটি করপোরেশনের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই পৃথক আইনি সত্তা বা লিমিটেড কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করপোরেশনের এবং করপোরেশনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। করপোরেট গভর্ন্যান্স ও জবাবদিহির কার্যকর কাঠামোও গড়ে ওঠেনি।”ফলে সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে, অথচ হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক আর্থিক সম্পর্ক যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত করে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত করা দরকার।’

মুসলিম চৌধুরীর মতে, অনেক ক্ষেত্রে করপোরেশনগুলো স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক সত্তার মতো না চলে সরকারি বিভাগের মতো পরিচালিত হয়। করদাতাদের অর্থ দেয়া হলেও তার ব্যবহার, দায়দেনা ও আর্থিক ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিশ্চিত করা হয় না। বিদেশী ঋণে অনেক সময় সরকারের গ্যারান্টি থাকে। প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত দায় সরকারের ওপর আসে। এতে রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ে, বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয় এবং জনস্বার্থমূলক অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা কমে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সামগ্রিক করপোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা দরকার ও কোনগুলো বেসরকারীকরণের উপযোগী, তা নির্ধারণ করতে হবে। আর্থিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত প্রতিবেদন, কার্যকর নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এসব প্রতিষ্ঠানে করদাতাদের অর্থের অপচয় ও সরকারি আর্থিক দায়ের বোঝা বাড়তেই থাকবে।

আরও