ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণে উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। তিনি বলেন, জিআই পণ্যের নিবন্ধনকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এসব পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ ও নকল পণ্য প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রকৃত উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সচিব বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোকে যথাযথ আইনগত সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, ব্র্যান্ডিং, কার্যকর বিপণন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে বাণিজ্যিক সুফল প্রকৃত উৎপাদক, কারুশিল্পী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আব্দুন নাসের খান বলেন, ঐতিহ্য থাকা আর সেই ঐতিহ্যের আইনগত ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ করলেই চলবে না; এটিকে জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শক্তিতে পরিণত করতে হবে।
তিনি বলেন, জামদানি, নকশিকাঁথা, ফজলি আমসহ বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোর সঙ্গে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা নিবিড়ভাবে জড়িত। এসব পণ্যের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিলম্ব হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা জটিল হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে পণ্যের যথাযথ নথিভুক্তকরণ, জিআই নিবন্ধন, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্প সচিব বলেন, জিআই নিবন্ধনই গন্তব্য নয়, এটি কেবল যাত্রার শুরু। নিবন্ধনের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাবেন, বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং নকল পণ্যের কারণে ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
তিনি বলেন, জিআই পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণে উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ, বিপণন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সমন্বয়ে কার্যকর মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে পণ্যের স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বাণিজ্যিক সাফল্যের সুফল সরাসরি প্রকৃত উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী পেতে পারেন।
সেমিনার থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল প্রত্যাশা করে শিল্প সচিব বলেন, যেসব ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জিআই সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি, প্রথমে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ইতোমধ্যে নিবন্ধিত পণ্যগুলোর বাণিজ্যিকীকরণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘জিআই বাংলাদেশ’ শুধু একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়; বরং এটি যেন স্বকীয়তা, গুণগত মান ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারাওয়াত সিরাজ শুল্কা।
অনুষ্ঠানে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের স্বত্বাধিকারী মনিরা ইমদাদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমাম হোসেন সিডনী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রভাষক আব্দুর রাজ্জাক মজুমদারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন।