রাত ১১টার পর গ্যাস এলে শ্রমিকরা কাজ শুরু করেন। সকাল হতে না হতেই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবার বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সংকটের কারণে এমন পরিস্থিতি চলছে।
কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার আলম মিয়া বলেন, ‘গ্যাস সংকট দেখা দেয়ার পর সিএনজি স্টেশন থেকেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কনটেইনার পাঠালে তারা ফেরত পাঠায়। এক মাস ধরে এমন অবস্থা চলছে, গ্যাসের সব কাজ বন্ধ। আমাদের এখানে ওয়াশের কাজ হয়। এটার জন্য গ্যাসের বিকল্প নেই। এখন দিনে কারখানা বন্ধ রাখি। রাতে যখন গ্যাস আসে তখন চালাই।’
গ্যাস সংকটে দেশের অনেক শিল্পাঞ্চলেই এখন এমন চিত্র। কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কাজ হারানোর আশঙ্কা করছেন শ্রমিকরা।
সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের প্রায় সব শিল্প-কারখানাতেই গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন কারখানা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ থাকার কথা ২০ পিএসআই। সাধারণ সময়ে পাওয়া যায় ৮ থেকে ১০ পিএসআই। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২ থেকে ৩ পিএসআইয়ে। এ চাপ দিয়ে কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
সাভারের একটি বৃহৎ শিল্প-কারখানার জেনারেল ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের চাপ সংকটে আমরা বয়লার চালাতে পারছি না। একটা বয়লার চালাতে গ্যাসের চাপ কমপক্ষে ৫ পিএসআই থাকতে হয়। সেখানে আমরা পাচ্ছি ২ থেকে সর্বোচ্চ ৩ পিএসআই। ফলে বিকল্প জ্বালানি দিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। এতে উৎপাদন খুব একটা ব্যাহত হচ্ছে না, কিন্তু খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদে চলে তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়বে।’
বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন এমন অনেকেই। তারা বলছেন, পণ্যের দাম বাড়ালে বিদেশী বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নেবে। তখন তারা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় চলে যাবে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় প্রতি মাসে শুধু ডিজেল বাবদ ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে উইন্টার ড্রেস লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কারখানাটিতে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিরামিক শিল্পেও। ধামরাইয়ের মুন্নু সিরামিক ও প্রতীক সিরামিকের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে কিলন সচল রাখা এবং সময়মতো রফতানি আদেশ বা পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোয়ও। সাভারের রেডিও কলোনি এলাকার সাহারা সিএনজি স্টেশনের ক্যাশিয়ার বিজয় হোসেন জানান, স্বাভাবিকভাবে একটি সিএনজি স্টেশন পরিচালনার জন্য অন্তত ৩ থেকে ৪ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু কখনো শূন্য পিএসআই, কখনো ২ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে স্টেশনে শত শত গাড়ি এলেও গ্যাস দেয়া যাচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। গতকাল নারায়ণগঞ্জের প্রায় সব কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা ছুটি দিয়ে দিচ্ছে। কারণ কাজ করার মতো জ্বালানি নেই। নারায়ণগঞ্জে আজকে (গতকাল) প্রায় সব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। অনেক কারখানায় ছুটি দিতে হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় দুপুরে ছুটি হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিক আসার পর দেখেছে কাজ করার অবস্থা নেই, তখন ছুটি দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মোটাদাগে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৩০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছি।’
গাজীপুরেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। জেলার আবাসিক ও শিল্প খাতে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৫৯০-৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জানা গেছে এর বিপরীতে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরবরাহ করা হয়েছে ২৫০-২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে অনেক এলাকায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও চাপ খুব কম।
গাজীপুর তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সুরুজ আলম জানান, দুই-তিন মাস আগে সর্বোচ্চ ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে সরবরাহ তার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। গ্যাস না পেলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে যতটুকু গ্যাস পাওয়া যায়, ততটুকু সঠিক ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ করার নির্দেশনা সবসময়ই রয়েছে।
গাজীপুরের কারখানাসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে মাত্র ২ থেকে ৪ পিএসআই চাপে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে এ অবস্থা চলছে। কেউ কেউ ডিজেল দিয়ে বয়লার চালাচ্ছেন। এতে গ্যাসের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি খরচ হচ্ছে। বড় কারখানাগুলো কিছুদিন সচল রাখতে পারলেও মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন ৬ ঘণ্টার মতো ইলেকট্রিসিটি থাকছে না। আমরা প্রতিদিন মাত্র ১০ ঘণ্টা কারখানা সচল রাখতে পারছি। এতে কমিয়ে দিতে হয়েছে উৎপাদন এবং অনেক ইউনিট বন্ধ করতে হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে ডিজেল দিয়ে বয়লার চালাতে হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘একদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা, অন্যদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধ ও কনটেইনার জটের কারণে পণ্য জাহাজীকরণেও সমস্যা হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের লিড টাইম বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। আর বর্তমান নানা সংকটের কারণে আমদানি ও রফতানি লিড টাইম আরো বাড়ছে।’
গাজীপুরে কারখানার মালিকরা তিন শিফট চালু রেখে যখনই গ্যাসের চাপ পাচ্ছেন, তখনই কাজ করার চেষ্টা করছেন। তবে এ সংকটে জেলার ১০-১৫ শতাংশ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা বন্ধের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন।
ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যে ২০টি কারখানার শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটি দেয়া হয়েছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে, শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোয় উৎপাদন গড়ে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে ২৯৩টি শিল্প-কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি গ্যাসচালিত। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে গ্যাসচালিত প্রায় সব কারখানাই সংকটে পড়েছে। জেনারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আংশিক উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টেক্সটাইল ও সুতা তৈরির কারখানাগুলো। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসে ৫০টি মেশিনের মধ্যে ৪৩টিই বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাকি সাতটি মেশিন পিডিবির বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হচ্ছে। ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলসের ৩০টি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ। এতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সে উৎপাদন ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি কমেছে। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় ৪০ শতাংশ মেশিন বন্ধ আছে। সিরামিক খাতের এক্সিলেন্ট সিরামিকসের ফার্নেস বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমেছে।
শিল্প পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গতকাল গ্যাসের চাপ কম থাকায় দুপুরের খাবারের সময় মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেড, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল, বিএসপি স্পিনিং মিলসহ ২০টি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের ছুটি দেয়া হয়।
ভালুকায় বস্ত্র ও পোশাক খাতের একটি কারখানার ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে গ্যাসের চাপ কম। কারখানায় গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে ১২ পিএসআই। এতে উৎপাদন ৩-৪ শতাংশ কমেছে।
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পাঞ্চলে কারখানায় ছুটি ও উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে কাজ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এ ধরনের আশঙ্কা আছে কিন্তু আমাদের জানামতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের উদ্যোগ রয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা আশঙ্কা করতেই পারেন। কারণ উৎপাদন না থাকলে উদ্যোক্তা বেতন দিতে পারবেন না। বেতন না দিতে পারলে একটা পর্যায়ে কারখানা লে-অফ ঘোষণা করবেন। কাজেই শ্রমিকদের আশঙ্কা ঠিক আছে। কিন্তু আমরা মনে করছি সরকারের প্রচেষ্টায় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল অবশ্য বলছেন, শ্রমিকের কর্মচ্যুতির আশঙ্কা বাস্তবেই তৈরি হয়েছে। তার কথায়, ‘প্রতিদিনই আমরা লে-অফের চিঠি পাচ্ছি। কাজেই অনেক শ্রমিকের কর্মচ্যুতি হবে।’
গতকাল সন্ধ্যায় শওকত আজিজ রাসেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে সংগঠনের ১ হাজার ৮৫০টির মধ্যে ৯০০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে শিল্প টিকবে না।’
যতদিন কারখানা বন্ধ থাকবে, ততদিনের সুদহার কমানো বা মওকুফ এবং ব্যাংকের অর্থ পরিশোধের জন্য দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড চেয়েছেন তারা।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি