জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট প্রভাব মোকাবেলায় দেশীয় অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে বাংলাদেশ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সি৩ইআর) এক প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক কর্মশালায় আজ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) ২০২৬-৩১ বাস্তবায়নে অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন। তীব্র তাপপ্রবাহ, জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ, অনিরাপদ পানি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহের পথও তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫ বছরে ১৪০ কোটি ডলার বা ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সি৩ইআর) উপদেষ্টা ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য, পানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এইচএনএপি দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের এ উদ্যোগকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়নও প্রয়োজন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দেয়া জরুরি।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর)-এর উপ-পরিচালক রৌফা খানম। সেখানে বলা হয়, গবেষণায় চারটি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় সরকারি অর্থায়ন থেকে ৩৮ কোটি ডলার, অন্যান্য খাতের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অবদান থেকে ৩৬ কোটি ডলার, উন্নয়ন সহযোগীদের কর্মসূচি থেকে ৫২ কোটি ডলার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নব্যবস্থা থেকে ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এগুলো প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা, নিশ্চিত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়। একাধিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরো উল্লেখ করা হয়, দেশীয় অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প তৈরির সময় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি যুক্ত করা গেলে এসব অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব(জাতিসংঘ ২) ড. কাজী শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রের পাশাপাশি কমিউনিটির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদেরও এ ধরনের উদ্যোগে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। বাংলাদেশের চলতি বছরের বাজেট প্রসঙ্গে বক্তা বলেন, সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এসব খাতে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুফল বা রিটার্নের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। বেসরকারি খাত ও তৃতীয় খাতের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
জেষ্ঠ্য পরিচালক এবং জলবায়ু কার্যক্রম বিভাগের প্রধান কাজী এমদাদুল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাজেট বিশ্লেষণের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সংযোগ কোথায় রয়েছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি। কোনো একটি খাতের কার্যক্রম অসম্পূর্ণ থাকলে অন্য খাতের বিনিয়োগ থেকেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া নাও যেতে পারে। এ কারণে চলমান বাজেট বিশ্লেষণ ও অর্থায়নের পরিকল্পনা কতটা যথাযথ হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলে সেই অর্থ থেকে কী পরিমাণ সুফল পাওয়া যাবে, তারও স্পষ্ট হিসাব থাকা উচিত। দুর্যোগ মোকাবেলায় বিনিয়োগের ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও সাড়াদানের ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব, তা নিরূপণ করা জরুরি। বিনিয়োগের বিপরীতে কী পরিমাণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তার হিসাব জলবায়ু অর্থায়নের আলোচনায়ও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক স্তর থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বড় সুযোগ আছে। কিন্তু যথাযথভাবে সেটি আনা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওগুলোর সমন্বয় জরুরি। ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
আলোচকরা স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্টদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি নিয়ে প্রশিক্ষিত করার ওপর জোর দেন। এছাড়া শিক্ষা কারিকুলামে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তারা।