প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা

পাঠককে নতুন দৃষ্টিকোণ দেবে ‘আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা’

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, আবুল মনসুর আহমদের চিন্তাশক্তি ছিল অসাধারণ। তিনি অনেক রকম কাজ করছেন। আবুল মনসুর আহমদ বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। তার মতো শক্তিশালী লেখককে নিয়ে আরো আগেই লেখালেখি হওয়া উচিত ছিল

আবুল মনসুর আহমদের চিন্তাশক্তি ছিল অসাধারণ। তিনি অনেক রকম কাজ করছেন। আবুল মনসুর আহমদ বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। তার মতো শক্তিশালী লেখককে নিয়ে আরো আগেই লেখালেখি হওয়া উচিত ছিল। পূর্ব বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের ভাবনা ও যুক্তি পাঠককে নতুন দৃষ্টিকোণ দেবে। তার ‘আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা’ বইটি চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করবে।

গতকাল বিকালে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা’ বইটি লিখেছেন রোচনা মজুমদার। প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।

ঔপনিবেশিক আমল থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণার ক্রমবিবর্তন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে দেশভাগ, মুসলমানদের আত্মচেতনা, সাংস্কৃতিক ভাবনা, ভাষা, সাহিত্য ও স্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষা—বিবিধ বিষয় উঠে আসে আলোচকদের বক্তব্যে।

লেখক রোচনা মজুমদার তার আলোচনার শুরুতেই বইটি প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে, আলোচক ও শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আবুল মনসুর আহমদের রচনায় ভাষার অনেক নিরীক্ষা আছে, আছে চিন্তার গভীরতা। এ বইয়ে তিনি মূলত ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গিতে আবুল মনসুর আহমদকে অনুসন্ধান করেছেন।

তিনি বলেন, আমি চেষ্টা করছি যেন তার মাথার ভেতরে ঢুকে তার ভাবনাটা অন্য ভাষায় অন্তত বিশ্বের ইংরেজি জানা পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতে পারি।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, আবুল মনসুর আহমদের চিন্তাশক্তি ছিল অসাধারণ। তিনি অনেক রকম কাজ করছেন। আবুল মনসুর আহমদ বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। তার মতো শক্তিশালী লেখককে নিয়ে আরো আগেই লেখালেখি হওয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করতেন, প্রমিত বাংলা ভাষার মধ্যে পূর্ব বাংলার ভাষার হিস্যা কম পড়েছে। এটা তাকে পীড়িত করেছিল। সে কারণে তিনি ভাষাসংস্কৃতিবিষয়ক যে প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন, তা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। আগামী দিনে তাকে নিয়ে আরো বড় পরিসরে আলোচনা হবে। পাঠকেরা এ বইয়ে আবুল মনসুর আহমদকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টিকোণ পাবেন।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তৈমুর রেজা বলেন, বইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আবুল মনসুর আহমদের চিন্তাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা খুব প্রয়োজন ছিল। আবুল মনসুর আহমদ মনে করতেন, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেই প্রকৃত স্বাধীন হবে না। স্বাধীনতা যথার্থ হবে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে। তিনি একে বলেছেন ‘কালচারাল অটনমি’।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ শ্রোতাদের কাছে বইটি প্রকাশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সমাজের স্বাতন্ত্র্য ভাষার বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য আবুল মনসুর আহমদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। ‘‌বাংলা’ থেকে যে ‘‌পূর্ব বাংলা’ আলাদা হয়ে উঠল, তার দীর্ঘ পরম্পরা আছে। আমরা রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলেও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করিনি। ‘‌পূর্ব বাংলা’ বললেই ‘‌পশ্চিম বাংলা’ যে আছে, তা বলা হয়ে যায়। উভয় বাংলার মধ্যে যেমন মিল আছে, তেমনি পার্থক্যও আছে অনেক। কীভাবে এ পার্থক্য হলো, এসব বিষয় বোঝা দরকার। এ জানা-বোঝার জন্য আবুল মনসুর আহমদ পাঠ করা জরুরি।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান লেখক, আলোচকসহ সমাগত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, প্রথমা প্রকাশন থেকে আমরা সৃজনশীল সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতির মতো বিভিন্ন বিষয়ের মননশীল, গবেষণামূলক বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা চেয়েছি নতুন প্রজন্মের মধ্যে, নতুন চিন্তার সূত্রপাত হোক। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বিভক্তি, বিশৃঙ্খলা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। একটি নতুন পথের অনুসন্ধান করতে হবে। আমরা নতুন পথের সন্ধানে সক্রিয় আছি। থাকব।

দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম লেখক রোচনা মজুমদারকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, তিনি আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ অনুবাদ করতে গিয়ে শুধু অনুবাদকের মতো নয়, প্রকৃতপক্ষে একজন গবেষকের মতো কাজ করেছেন। লেখকের পরিবার, জন্মস্থান, তার গ্রামের পরিবেশ দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসেছেন।

অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথমা প্রকাশনের মেরিনা ইয়াসমিন। তিনি বইটির লেখক যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস এবং সিনেমা অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের জর্জ ভি বব্রিনস্কয় অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস বিভাগের চেয়ার রোচনা মজুমদারের পরিচিতি তুলে ধরেন। দেশের সাহিত্য ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশিষ্টজন, তরুণ প্রজন্মের লেখক ও আগ্রহী পাঠকেরা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।

আরও