পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন নোয়াখালীর তৈয়ব আলী। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ টাকাই ছিল ঋণের। বাকি টাকা জোগাড় করেছিলেন গরু ও স্ত্রীর গহনা বিক্রি এবং আত্মীয়স্বজন থেকে ধার করে। কথা ছিল সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানে প্যাকেজিংয়ের কাজ করবেন তিনি। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর প্রায় দুই মাস কাজ ছাড়াই বসিয়ে রাখা হয় তাকে। পরে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে অস্থায়ী কাজ দেয়া হলেও নিয়মিত বেতন পেতেন না। জীবিকার খরচ চালাতে একপর্যায়ে পরিবার থেকেও টাকা নিতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কোনো কাজের ব্যবস্থা না হওয়ায় ছয় মাসের মধ্যেই দেশে ফিরে আসেন তৈয়ব।
তৈয়বের মতো প্রতি বছর অনেক বাংলাদেশী অভিবাসী ভিসা বাণিজ্যের শিকার হয়ে প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। বিদেশ যাওয়ার আগে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা জানেন না, তারা কোন প্রতিষ্ঠানে কী কাজ করবেন, নির্ধারিত বেতন কত কিংবা চাকরির শর্ত কী। নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে প্রকৃত চুক্তিপত্র না পাওয়াই এর অন্যতম কারণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র দেয়া হলেও বিদেশে গিয়ে দেখা যায়, সেটির সঙ্গে প্রকৃত নিয়োগকর্তা, কাজ বা বেতনের মিল নেই। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এমন কিছু নথি মধ্যস্থতাকারী বা দালালরা নিজেদের মতো করে তৈরি করে কর্মীদের হাতে দেন।
এ বিপুল অঘোষিত লেনদেনের সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে এর আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় বিদেশগামী কর্মীদের প্রকৃত অভিবাসন ব্যয় থেকে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছর ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি দেশে যাওয়া কর্মীদের সরকার নির্ধারিত হারে অভিবাসন ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অথচ মাঠপর্যায়ে পাওয়া দেশভিত্তিক সর্বনিম্ন ব্যয় ধরলেও মোট খরচ দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় ব্যবধান প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এ অতিরিক্ত অর্থ ভিসা কেনাবেচা, মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন ও বিভিন্ন পর্যায়ের অননুমোদিত ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যদিও এ অদৃশ্য বাজারের আকার নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও সরকারি বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশী কর্মীদের প্রকৃত অভিবাসন ব্যয় সরকার নির্ধারিত হারের তুলনায় অনেক বেশি। বিএমইটির বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা এবং মাঠপর্যায়ে পাওয়া দেশভিত্তিক ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিসা কেনাবেচা, মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন ও বিভিন্ন পর্যায়ের অননুমোদিত লেনদেন মিলিয়ে এ বাজারের আকার বছরে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশী নিয়োগকর্তার প্রকৃত চাহিদা, নির্দিষ্ট কাজ কিংবা বেতনের নিশ্চয়তা ছাড়াই অঘোষিত লেনদেনের মাধ্যমে দেশে কাজের অনুমতিপত্র কেনাবেচা হচ্ছে। অনেক পরিবার ভিটেমাটি, গহনা বা শেষ সম্বল বিক্রি করে এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এসব ভিসা কিনছে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না। বরং রিক্রুটিং এজেন্সি, মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের বিভিন্ন স্তরে অর্থ হাতবদল হতে হতে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, আর প্রবাসগামী শ্রমিকরা জড়িয়ে পড়ছেন ঋণের ফাঁদে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অস্বচ্ছ ভিসা বাণিজ্য বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাতের অন্যতম বড় সংকট।
কাজের অনুমতিপত্র কিংবা মৌখিকভাবে যেটি ভিসা নামে প্রচলিত এ বাণিজ্য কীভাবে কাজ করে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন সৌদি আরবের কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে কর্মী সাপ্লাই দেয়া বাংলাদেশী এজেন্ট জাকারিয়া সিকদার। বর্তমানে তার অধীনে প্রায় দেড় শতাধিক কর্মী কাজ করেন।
তিনি জানান, সৌদি আরবের একটি ভিসার প্রাথমিক খরচ প্রায় ২ হাজার রিয়াল, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। তবে কাজের অনুমতিপত্র সংগ্রহের পর্যায়েই এর সঙ্গে আরো এক-দেড় লাখ টাকা যুক্ত হয়। জাকারিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে এমন সৌদি কফিল বা মালিকের নামে কর্মীর ভিসা অনুমোদন নেয়া হয়, যার প্রকৃতপক্ষে ওই কর্মীর প্রয়োজন নেই। তিনি নিজের নামে দুই-তিনটি কাজের অনুমতিপত্র বের করে প্রতিটির বিপরীতে এক-দেড় লাখ টাকা নেন। কর্মী তার নিয়োগকৃত হিসেবে সৌদি আরবে প্রবেশ করলেও পরে কাজ করেন অন্য প্রতিষ্ঠানে। এভাবে একটি কাজের অনুমতিপত্র সৌদি আরবেই প্রায় ২ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। এরপর সেটি বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্ট ও দালালের মাধ্যমে কর্মীর কাছে পৌঁছার আগে আরো কয়েক দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপে কমিশন ও অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভিসার দাম প্রাথমিক খরচের তিন-চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।’ তার দাবি, পরবর্তী সময়ে ইকামা বা ভিসা নবায়নের সময়ও কফিলকে অতিরিক্ত ৫-৬ হাজার রিয়াল দিতে হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের মোট অভিবাসন ব্যয়ের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশই যায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের হাতে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এ হার আরো বেশি। অন্যদিকে ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ অভিবাসী তাদের অভিবাসন ব্যয়ের অর্থ রিক্রুটিং এজেন্সিকে এবং মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে থাকেন। জরিপের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই অভিবাসন খরচের বড় অংশ দালালদের হাতে যায়।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) কয়েকজন সদস্য জানান, ভিসা বাণিজ্যের পেছনে নিয়োগকর্তা ও বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যবর্তী সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রেই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সরাসরি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে কাজের চাহিদা না পেয়ে বিদেশী প্রতিনিধি বা এজেন্টদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ভিসা সংগ্রহ করে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে অননুমোদিত অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত মধ্যস্থতাকারী, সিস্টেম নিয়ন্ত্রণকারী এবং বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায়ের দালালের হাতবদলে ধাপে ধাপে চড়া কমিশন যুক্ত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বায়রার একজন সদস্য বণিক বার্তাকে জানান, সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে তালিকাভুক্ত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত হতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা করে দিতে হয়েছে। তার দাবি, পরবর্তী সময়ে এ বাবদ আরো কয়েক কোটি টাকা দিতে হবে। এর আগেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর সময় কর্মী পাঠানোর অনুমতি পেতে এজেন্সিগুলোকে জনপ্রতি ১ লাখ টাকার বেশি অর্থ দিতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশী নিয়োগকর্তা বা এজেন্টদের কাছ থেকে ভিসা কিনতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়। টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০১৬ সালেই ভিসা কেনার পেছনে আনুমানিক ৫ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে গেছে। পরে এসব ভিসা কর্মীদের কাছে বিক্রি করে আদায় করা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গন্তব্য দেশের বাংলাদেশ মিশনের কিছু কর্মকর্তা যথাযথ যাচাই ছাড়াই কিংবা ঘুসের বিনিময়ে ডিমান্ড লেটার বা চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেন। এরপর এসব ভিসা বিদেশী নিয়োগকর্তা, স্থানীয় এজেন্ট, বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সি ও তৃণমূল পর্যায়ের দালালসহ প্রায় ছয়-সাতটি স্তরে হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত ফি ও কমিশন যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অভিবাসন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ভিসা কেনার সর্বনিম্ন খরচ সিঙ্গাপুরে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কাতারে ১ লাখ ২০ হাজার, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ লাখ করে, বাহরাইন ও ওমানে ৭০ হাজার করে এবং সৌদি আরবে ৬৮ হাজার টাকা।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে বিদেশগামী কর্মীদের দেশভিত্তিক অভিবাসন খরচ নির্ধারণ করে দেয়। সৌদি আরবে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা, মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ওমান ও কাতারে ১ লাখ ৭৮০ টাকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ লাখ ৭ হাজার ৭৮০ টাকা, সিঙ্গাপুরে ২ লাখ ৬২ হাজার ২৭০ টাকা, বাহরাইনে ৯৭ হাজার ৭৮০ টাকা, কুয়েতে ১ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা, জর্ডানে ১ লাখ ২ হাজার ৭৮০ টাকা, রাশিয়ায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪০ টাকা এবং মালদ্বীপে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৮০ টাকা।
তবে মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৪ লাখ থেকে শুরু করে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে একজন কর্মীর। সৌদি আরব যেতে গড়ে কর্মীপ্রতি খরচ করতে হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। কেউ কেউ সর্বোচ্চ ৯ লাখ টাকাও ব্যয় করেছেন একটি ভিসা কিনতে। মালয়েশিয়ায় সরকার নির্ধারিত খরচ ১ লাখ টাকার নিচে হলেও প্রকৃত খরচ হয়েছে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা। কাতারে ৫-৬ লাখ টাকা, ওমানে ৪-৫ লাখ টাকা এবং সিঙ্গাপুরে ১৫-১৬ লাখ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে একটি ভিসা কিনতে। কেউ কেউ ১৮ লাখ টাকাও খরচ করছেন সিঙ্গাপুর যেতে। আর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে দেশভেদে ভিসাপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ১৬ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া ও মলদোভায় যেসব কর্মী যাচ্ছেন তারা জনপ্রতি খরচ করছেন ১৬-১৮ লাখ টাকা।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন গেছেন সৌদি আরবে। এরপর কাতারে ১ লাখ ৭ হাজার ৫৯৮ জন, সিঙ্গাপুরে ৭০ হাজার ৮৩২, কুয়েতে ৪২ হাজার ৭৪৬, মালদ্বীপে ৪০ হাজার ১৫৯, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৩ হাজার ৭৫০, জর্ডানে ১৩ হাজার ৩৭৫, কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৬৩, ইতালিতে ৯ হাজার ৩৬৫ ও কিরগিজস্তানে ৬ হাজার ৬৫২ জন কর্মী গেছেন। অর্থাৎ শীর্ষ ১০ গন্তব্যেই গেছেন ১০ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৪ জন, যা মোট বিদেশগামী কর্মীর প্রায় ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
সরকার নির্ধারিত হারে তাদের মোট অভিবাসন ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অথচ মাঠ পর্যায়ে পাওয়া বর্তমান ব্যয়ের সর্বনিম্ন হার ধরলেও একই সংখ্যক কর্মীর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫৮ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শীর্ষ সাত শ্রমবাজারেই সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বাংলাদেশী কর্মীরা।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অভিবাসন ব্যয় হয় বাংলাদেশী কর্মীদের। বাংলাদেশ পৃথিবীর বড় শ্রম রফতানিকারক দেশ না হলেও বর্তমানে বৈদেশিক অভিবাসনের তুলনায় দেশে রিক্রটিং এজেন্সির সংখ্যাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অনিয়ন্ত্রিত এজেন্সির বড় প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। তৃণমূল পর্যায়ে দালালদের দৌরাত্ম্য আর রিক্রুটিং এজেন্সি ও সাব-এজেন্টদের তীব্র প্রতিযোগিতায় বাড়ছে ভিসা বাণিজ্য।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৮৬০। আর প্রতিবেশী দেশ ভারতের জনশক্তি রফতানি খাতে রিক্রুটিং এজেন্সি আছে ১ হাজার ৯৮৮টি। কেবল ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি সক্রিয় আছে বাংলাদেশে। তবে এতে বেশি এজেন্সি থাকার পরও সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত ও এজেন্সিগুলোর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ভিসা বাণিজ্যে নতুন করে দালাল চক্রও তৈরি করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এজেন্সিগুলো দায়মুক্ত থাকতে সরাসরি কর্মীদের ভিসা না দিয়ে সাব-এজেন্ট নিয়োগ করেন। মাঠপর্যায়ের দালালদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি কাঠামোর আওতায় না আনায় তারা সকল প্রকার জবাবদিহিতার বাইরে থেকে যায়। এ আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে দালালরা চড়া বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। বিদেশে চাকরির সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য না জানলেও প্রবাসগামী কর্মীরা কেবল দালালের ওপর ভরসা করে আর্থিক লেনদেন করে থাকেন। ভিসা চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার আগেই কিস্তিতে টাকা দিতে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবাসীরা যখন দেশ ছাড়ার জন্য বিমানবন্দরে পৌঁছান, ঠিক তখনই তাদের হাতে কাজের চুক্তিপত্র তুলে দেয়া হয়।
বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে সরকারকে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাব্যাংক তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়ম বন্ধে সমন্বিত ও স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। এজন্য বিএমইটির অধীনে একটি সর্বজনীন ডেটাব্যাংক তৈরি করতে হবে, যেখান থেকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বাধ্যতামূলকভাবে কর্মী বাছাই করবে। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় কেবল প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বা নির্ধারিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নগদ লেনদেনের সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ফির বেশি অর্থ আদায় বা ডেটাব্যাংকের বাইরে কর্মী নিয়োগের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর বিধান রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মীদের উচ্চ অভিবাসন ব্যয় ও ভিসা বাণিজ্যের অন্যতম কারণ দক্ষতা ও ভাষাগত যোগ্যতার ঘাটতি। ফলে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে তাদের দরকষাকষির সক্ষমতা কমে যায় এবং বিদেশী মধ্যস্বত্বভোগী ও সাপ্লাই কোম্পানির কাছ থেকে চড়া দামে ভিসা নেয়ার ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। বিপরীতে ভারত, নেপাল ও শ্রীলংকার অনেক কর্মী ভাষা ও কারিগরি দক্ষতায় এগিয়ে থাকায় কম খরচে কিংবা এমপ্লয়ার পে মডেলে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান, বিপরীতে বাংলাদেশ শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যাকে প্রাধান্য দেয়ায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়ায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রথাগত জিটুজি পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানো সম্ভব নয় বলে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা অনিবার্য। তাই এ খাতে অনিয়ম কমাতে গন্তব্য দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর তদারকি জোরদার, ভিসা কেনাবেচায় স্বচ্ছতা এবং বিদেশগামী কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি।’
রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদেরও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে উল্লেখ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিঙ্গাপুর যেতে কীভাবে ১৫ লাখ টাকা লাগে? এত টাকা লাগার কথা না। প্রকৃত খরচ সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। ছয়টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে, তারা শতকোটি টাকার মালিক হয়েছে। অভিবাসন ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আমরা কাজ করছি। ধীরে ধীরে অভিবাসন ব্যয় একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে নিয়ে আসব। আগের সরকার বিভিন্ন দেশের যে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করেছিল সেটিকে আপডেট করতে এরই মধ্যে আলোচনা করেছি। সিঙ্গাপুরের বিষয়েও মিটিং হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশভিত্তিক অভিবাসন ব্যয় ঠিক করে দেয়া হবে। এ নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে কেউ অতিরিক্তি অর্থ কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে না।’