মিরসরাইয়ে শিল্পায়নে নষ্ট হচ্ছে ইলিশের প্রজনন অঞ্চল

২৫২ থেকে আহরণ নেমেছে ৮ দশমিক ৮১ টনে

ইলিশের বংশ বিস্তার ও প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে দেশে চারটি প্রজনন অঞ্চল ও ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে।

ইলিশের বংশ বিস্তার ও প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে দেশে চারটি প্রজনন অঞ্চল ও ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে। এর মধ্যে একটি রয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ডোমাখালী-সাহেরখালী বঙ্গোপসাগর মোহনায়। বাকি তিনটি পশ্চিম সৈয়দ আউলিয়া পয়েন্ট-তজুমদ্দিন, গণ্ডামারা-বাঁশখালী ও লতাচাপালি কলাপাড়া এলাকায়। তবে শিল্পায়নের কারণে প্রজনন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য হারে কমছে ইলিশ উৎপাদন। সেই সঙ্গে কমেছে আহরণও। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মিরসরাইয়ে পাঁচ বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ২৪৩ দশমিক ৪৯ টন।

স্থানীয় মৎস্যজীবীরা বলছেন, একসময় জেলে নারীরা গ্রামে ঘুরে ঘুরে ইলিশ বিক্রি করতেন। এখন তাদের কালেভদ্রেও চোখে পড়ে না।

মায়ানি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের জেলে রণজিৎ জলদাশ জানান, ইলিশ এখন সোনার হরিণ। আগে সাহেরখালী ডোমখালী এলাকায় প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন গভীর সমুদ্রে গিয়েও ইলিশ পাওয়া যায় না। ইলিশ প্রজনন অঞ্চলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে।

ইলিশ প্রজনন অঞ্চল বলতে নদী বা সাগরের এমন বিশেষ এলাকাকে বোঝায়, যেখানে ইলিশ মাছ প্রজননের জন্য ডিম ছাড়ে এবং সে ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। এ অঞ্চলগুলোয় ইলিশের একটি নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুম থাকে এবং এ সময়ে মাছের আনাগোনা বেশি হয়। প্রজনন ক্ষেত্রগুলো সাধারণত নদীর মোহনা ও উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। যেখানে ডিম থেকে রেণু বা জাটকা বড় হওয়ার পর সাগরে ফিরে যায়।

সাগরে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে দুই দফায় ৮৭ দিনের নিষেধাজ্ঞা, আট মাসব্যাপী জাটকা নিধন এবং সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা ও জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন। এছাড়া প্রতি বছরের ২০ মে থেকে ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। ওই সময় উপজেলার ২ হাজার ১২৬টি জেলে পরিবারকে দুই দফায় ৮৬ কেজি চাল সহায়তা দেয়া হয়।

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, মিরসরাইয়ে ২৯টি জেলেপল্লীতে নিবন্ধিত মৎস্যজীবী রয়েছেন ২ হাজার ৫৫৭ জন। ২০১৬ সালের আগে ২ হাজার ২৬ জন জেলে নিবন্ধিত হন। ২০২১ সালে নিবন্ধিত হন ১০০ জন। এর পরের বছরগুলোয় নিবন্ধন পায় আরো ৪৩১ জন। প্রধান প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে সরকার ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ সময় উপজেলার ১ হাজার ৫০০টি জেলে পরিবার ২৫ কেজি করে চাল পায়। এছাড়া নভেম্বর-জুন পর্যন্ত আট মাসের নিষেধাজ্ঞায় ৬২০ পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেয়া হয়। তবে আট মাসের বন্ধে জেলেরা ভিজিএফ সহায়তা পায় মাত্র চার মাস। প্রজনন অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সোনালি স্বপ্নের সাবেক সভাপতি মনিরুল হোসেন টিপু বলেন, ‘মিরসরাইয়ে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ইলিশের নিরাপদ একটি প্রজনন অঞ্চল রয়েছে। একসময় বিটিভির বিজ্ঞাপনে নাম শোনা যেত, ডোমখালী ও সাহেরখালী খালের মোহনায় মা-মাছ ডিম ছাড়ে। কিন্তু জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ইলিশ প্রজনন কেন্দ্রের পাশে বালি উত্তোলন করায় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়া শিল্পায়নের প্রভাবে কমছে ইলিশ উৎপাদন।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে মিরসরাইয়ে ইলিশ আহরণ হয়েছে ২৫২ দশমিক ৩ টন। ২০২২ সালে এক ধাক্কায় আহরণ কমে যায় ১০৪ দশমিক ৯ টন। ওই বছর ইলিশ আহরণ হয় ১৪৭ দশমিক ৪ টন। ২০২৩ সালে আহরণ হয় ১১৬ টন। ২০২৪ সালে আবারো বড় ধরনের ধাক্কা খায় ইলিশ আহরণে। ওই বছর আহরণ হয় মাত্র ৩৬ দশমিক ৪৯ টন। এক ধাক্কায় ইলিশ আহরণ কমে যায় ৭৯ দশমিক ৫১ টন। চলতি বছর জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত ইলিশ আহরণ হয়েছে ৮ দশমিক ৮১ টন।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলেদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু জেনেছি, ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে প্রজনন ক্ষেত্রগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে ফেলায় ইলিশ আহরণ কমছে। উৎপাদন বাড়াতে আমরা নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোয় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’

আরও