সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বাস চলাচলের কারণে টার্মিনালগুলোয় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে, এর প্রভাবে যানজট বাড়ছে পুরো নগরে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করছে নতুন সরকার। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত বাসের রুট পারমিট বাতিলেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাসগুলোকে এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে টার্মিনালগুলোর চাপ যেমন কমবে, রাজধানীর সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থায়ও শৃঙ্খলা ফিরবে বলে তারা মনে করছেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী টার্মিনালের প্রকৃত ধারণক্ষমতা মাত্র ২৫০টি বাসের। অথচ সেখানে চলাচল করছে ৮০০ থেকে ১ হাজার বাস। আন্তঃজেলা এ টার্মিনাল থেকে মূলত উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর এবং পাটুরিয়া, আরিচা ও মাওয়া রুটের বাস চলাচল করে থাকে।
মহাখালী বাস টার্মিনালে ৩৫০টি বাস রাখার জায়গা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি বাস যাতায়াত করছে। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলার বাসগুলো ছেড়ে যায় রাজধানীর একেবারে মধ্যখানে অবস্থিত এ টার্মিনাল থেকে। অন্যদিকে সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের বাস ছেড়ে যায়। রাজধানীর বৃহত্তম এ টার্মিনালে ৬৫০টি বাসের ধারণক্ষমতা। এর বিপরীতে চলাচলরত বাসের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০-এ। সে হিসাবে টার্মিনালগুলোর প্রতিটিতেই বর্তমানে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি বাস চলাচল করছে, যা রাজধানীর পরিবহন শৃঙ্খলায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ।
সম্প্রতি সায়েদাবাদে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালের সর্বত্রই এলোমেলোভাবে বাস রাখা। ভেতরে নির্ধারিত কাউন্টার ও সংলগ্ন খোলা জায়গা থাকলেও বাস্তবে তা ব্যবহার করা হয় না। এর পরিবর্তে অধিকাংশ বাস মূল সড়কের ওপর দাঁড় করানো হয়। ফলে যাত্রীদেরও ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি সড়ক থেকেই বাসে উঠতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় পরিবহন কর্তৃপক্ষ নিয়ম ভেঙে টার্মিনালের বাইরে একাধিক কাউন্টারও স্থাপন করেছে। সেগুলো থেকে নির্বিঘ্নে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে এবং যাত্রীদের সরাসরি সড়ক থেকেই তোলা হচ্ছে বাসে। এতে সড়কের একটি বড় অংশ দখল হয়ে পড়ছে, যা বিঘ্ন সৃষ্টি করছে স্বাভাবিক যান চলাচলে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে এ সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে।
ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোয় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বাস চলাচলের বিষয়টি পরিবহন মালিকরাও স্বীকার করছেন। অনেক পরিবহন কোম্পানি টার্মিনালগুলোকে ডিপোর মতো করে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার বিভিন্ন টার্মিনালে প্রয়োজনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বাস অবস্থান করছে, যা সড়কে যানজট তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত টার্মিনালের বাইরে সড়ক ও আবাসিক এলাকায় বাস পার্কিং করা হচ্ছে, যা নগর জীবনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।’
এ সমস্যার সমাধানে রোটেশনভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানান সাইফুল আলম। তার মতে, নির্দিষ্টসংখ্যক বাস টার্মিনালে থাকবে। বাকিগুলো নিজস্ব ডিপো বা নির্ধারিত পার্কিংয়ে থাকবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চলাচল করবে। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে টার্মিনালগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের কাছে এ পরামর্শ পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকার তীব্র যানজট নিরসনে সরকার অবশ্য আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করছে। গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে অতিরিক্ত বাসের চাপ কমাতে রুট পারমিট বাতিলের মতো সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ঢাকার যানজট সমস্যা নিয়ে গত ২৪ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, টার্মিনালগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বাস চলাচল এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে আশপাশের সড়কগুলোয় প্রায় সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টার্মিনালের ধারণক্ষমতার বাইরে থাকা বাসগুলোর রুট পারমিট বাতিলের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে বাস মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয় ওই সভায়।
টার্মিনালগুলোয় বাসের সংখ্যা কমিয়ে আনার পাশাপাশি বাস টার্মিনাল স্থানান্তর ও বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও একই সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ঢাকার অভ্যন্তরীণ চারটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল—মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়াকে শহর থেকে বাইরে স্থানান্তর কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর বাইরে গুলিস্তানসংলগ্ন এলাকায় সিটি বাস সার্ভিসের জন্য একটি নির্দিষ্ট টার্মিনাল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এক্ষেত্রে ফুলবাড়িয়া আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে বিআরটিসি বাস ডিপো কমলাপুরে এবং দূরপাল্লার বেসরকারি বাসের কাউন্টারগুলো সায়েদাবাদে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়। আর সায়েদাবাদের ওপর চাপ কমাতে কাঁচপুরে নির্মাণাধীন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেয়া হয়েছে।
ঢাকার তিন বাস টার্মিনালের মধ্যে গাবতলী ও মহাখালী পড়েছে উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি)। বাস টার্মিনাল দুটি থেকে অতিরিক্ত বাস সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোতে যেসব অতিরিক্ত বাস রয়েছে, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেব। গত বুধবারও এ বিষয়ে একটি সভা করেছি। সভায় বিআরটিএ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারাসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা উপস্থিত ছিলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, টার্মিনাল ব্যবহার করা যেসব বাসের অর্থনৈতিক আয়ু ফুরিয়ে গেছে, যেসব বাসের ফিটনেস এবং প্রয়োজনীয় কাগজ ঠিক নেই সেগুলোর রুট পারমিট বাতিল করে দেব। পর্যায়ক্রমে ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোর বাসের সংখ্যা ধারণসীমার মধ্যে আনা হবে।’