বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। তবে তুলনামূলকভাবে সেখানে বাড়ছে না নারীর অংশগ্রহণ। সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাধা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কম থাকায় পিছিয়ে পড়ছে নারীরা। এক্ষেত্রে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কিশোরী ও যুবতী নারীদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর সফল অংশগ্রহণে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘কিশোরী ও যুবতীদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বাজার প্রস্তুতির সংস্কার’ শিরোনামে এ সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সেভ দ্য চিলড্রেন, দ্য আর্থ সোসাইটি ও ইউসেপ বাংলাদেশের সহযোগিতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
সংলাপে শ্রম অধিকার সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিকের অধিকার এবং কল্যাণের পূর্ব শর্তই হচ্ছে তাকে একটা ভালো কাজের জন্য তৈরি করা। এজন্য দরকার তাকে প্রয়োজনীয় দক্ষ করে গড়ে তোলা। যাতে সে নিজেকে ভালো কাজের জন্য আস্থাবান মনে করতে পারে। বেশিরভাগ কারখানা স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে চাকরি হারাচ্ছেন শ্রমিকরা।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের প্রত্যেক জেলার বিশেষত্ব হচ্ছে শতবর্ষ ধরে চলে আসা কোনো পারিবারিক শিল্প অথবা নকশীকাঁথার মতো নারীদের তৈরি কোনো শিল্প। এগুলোকে মাথায় রেখে আমরা নির্দিষ্ট জেলার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় বিবেচনা করে একটা মডেল দাঁড় করাতে পারি। সেটাকে কেন্দ্র করে ওই জেলার শিল্প গড়ার জন্য প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।
সংলাপে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। কিশোরগঞ্জ জেলাকে কেস স্টাডি ধরে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। মোট ১ হাজার ৭২৮ কিশোরী ও যুবতী নারীর ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৪ শতাংশ যুবতী নারীই চাকরি খুঁজছেন। তবে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও কৌশল জানা না থাকায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ কিশোরী ও যুবতীই বলেছেন, তারা উপার্জনের উপায় খুঁজতে সহযোগিতা চান। তবে কীভাবে কী করতে হবে, তা জানেন না তারা।
এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেয়া, শিল্পায়নের স্থানীয়করণ ও ডিজিটাল স্বাক্ষরতা তৈরিসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়েছে গবেষণায়। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কারণে জেলা পর্যায়ে কিশোরী ও তরুণীদের জন্য চাকরির বাজার অনেক চ্যালেঞ্জিং। এ কারণে শহুরে নারীদের চেয়ে গ্রামীণ নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণে অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম অধিকার কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে।
সংলাপে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান নাসরীন আফরোজ বলেন, শুধুমাত্র দক্ষতা তৈরি করলেই হবে না। সমাজে সচেতনতাও তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারলে বিশাল ভূমিকা রাখা যাবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা প্রায় ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার থাকেন। তাদেরকে কর্মসংস্থানে নিয়ে আসতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষরের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য রাশেদা কে চৌধুরীর সঞ্চালনায় সংলাপে আরো বক্তব্য রাখেন সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক তানিয়া শারমিন, দ্য আর্থ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভাইস-চেয়ারম্যান শাকিলা সাত্তার, কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির পরিচালক খলিলুজ জামান, উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শীজান খান প্রমুখ।