এসব উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভিন্ন ভিত্তি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। আর এটি এখন শুধু অবকাঠামোর বিষয় নয়, বরং কৌশলগত অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। শিল্প খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু জ্বালানির প্রাপ্যতা নয়, বরং জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা এবং গুণগত (পাওয়ার কোয়ালিটি) মান। বিদ্যুতের ঘাটতি, ভোল্টেজের ওঠানামা, অনাকাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট—এসব কারণে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটে। পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে জেনারেটর চালানো এবং কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত খরচ নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে।
আমি ওষুধ শিল্প থেকে আমাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। যেখানে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি শুধু পরিচালনগত দক্ষতার জন্য নয়, এটি পণ্যের গুণগত মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে আমরা আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স ও জিএমপি স্ট্যান্ডার্ড মেনে স্টেরাইল ইনজেক্টেবল ওষুধ উৎপাদন করি। আমাদের ক্লিন রুম ফ্যাসিলিটিতে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ, হেপা ফিল্টারযুক্ত বায়ুপ্রবাহ এবং পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ২৪ ঘণ্টাই অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও বজায় রাখতে হয়।
হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ভোল্টেজের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে এ ভ্যালিডেটেড (অনুমোদিত ও যাচাইকৃত) পরিবেশগত শর্তগুলো ব্যাহত হতে পারে। এতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং উৎপাদন পুনরায় শুরু করার আগে ব্যাপক মান নিয়ন্ত্রণমূলক অনুসন্ধান চালাতে হয়। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে এটি শুধু উৎপাদন বন্ধ থাকার বা ডাউনটাইমের বিষয় নয়; বরং এটি সরাসরি পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়।
এছাড়া আমরা লাইফোলাইজড ইনজেকশন বা ফ্রিজ-ড্রাইড ইনজেক্টেবল মেডিসিন উৎপাদন করি, যা ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন প্রক্রিয়ার অন্যতম অত্যাধুনিক ও জটিল পদ্ধতি। এ প্রক্রিয়ায় একটি লাইফোলাইজেশন সাইকেল টানা তিন থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় পরিচালিত হয়। এ সময়ে যদি বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে পুরো ব্যাচ বাতিল করতে হতে পারে। ফলে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি, মূল্যবান কাঁচামাল নষ্ট হতে পারে এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো বায়োলজিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য, যেমন অ্যান্টি-ক্যান্সার ওষুধ বা ইনসুলিন, যা আমরা দেশীয় ও রফতানি বাজারের জন্য উৎপাদন করি। এগুলো অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য, যেখানে একটি ব্যাচের উৎপাদন ব্যয় কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এ ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পুরো ব্যাচ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এর ফলে রফতানি প্রতিশ্রুতি পূরণে বিলম্ব হতে পারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে যে সুনাম অর্জন করেছে, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আমাদের শিল্প খাতে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে পণ্যের গুণগত মান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড মেনে চলার সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। বেসরকারি খাত সবসময় এসব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ডিজেলচালিত জেনারেটর, ইউপিএস ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎ স্থানান্তর ব্যবস্থা এবং অন্যান্য ব্যাকআপ অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এগুলো অপরিহার্য হলেও পরিচালন ব্যয় এবং মূলধনি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। বাস্তবে জ্বালানি অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যক্তিগত মূলধন বিনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ এ সম্পদগুলো গবেষণা ও উন্নয়ন, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়করণ এবং রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা যেত।
তাই নির্ভরযোগ্য জ্বালানি শুধু নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য নয়; এটি পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রফতানি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা এবং বাংলাদেশকে একটি বিশ্বস্ত উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব দেশ তাদের জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ করেছে এবং জ্বালানি ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করেছে, তারা বহিরাগত ধাক্কা (এক্সটার্নাল শক) মোকাবেলায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের সামনেও সুযোগ রয়েছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, বিদ্যুৎ গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা এবং পাওয়ার কোয়ালিটি উন্নত করার।
যদি আমরা একটি নির্ভরযোগ্য, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যৎ উপযোগী জ্বালানি ব্যবস্থা (ফিউচার রেডি এনার্জি ইকোসিস্টেম) গড়ে তুলতে পারি, তাহলে আমাদের শিল্প খাত আরো শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের গতি আরো ত্বরান্বিত হবে।