‘প্রতিযোগিতার পরিবেশ সমান না থাকলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আসবে না’

দেশের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানি ও স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে কাজ করছেন মাসুদ খান। বর্তমানে তিনি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের চেয়ারম্যান।

পাশাপাশি সিঙ্গার বাংলাদেশ, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) ও কমিউনিটি ব্যাংকের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও যুক্ত আছেন। এছাড়া ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির পর্ষদে উপদেষ্টার ভূমিকায় রয়েছেন তিনি। সম্প্রতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পুঁজিবাজার পরিস্থিতির নানা দিক নিয়ে তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রাহাত

দেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার হচ্ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। অর্থাৎ পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বলতে গেলে অনেক কম। কিন্তু বিদেশের পুঁজিবাজারগুলোতে প্রধান বিনিয়োগকারী হচ্ছে পেনশন ফান্ড। সেখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীও আছেন, তবে কম। বাংলাদেশে যেসব পেনশন ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড রয়েছে সেগুলো শুধু সঞ্চয়পত্র এবং ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারত। তিন-চার বছর আগে একটা নতুন প্রজ্ঞাপন এল যে এসব ফান্ডের ২৫ শতাংশ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে, যদিও কেউ বিনিয়োগ করেননি। কারণ তাদের সে আস্থা নেই। ভারতে পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির ১৩০ শতাংশ, আর আমাদের মাত্র ৬ শতাংশ। এর কারণ ভারতে মিউচুয়াল ফান্ড খাত অনেক বড়। তারাই মোটামুটি পুঁজিবাজার চালায়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাত যাত্রা শুরু করলেও অনেকগুলো ফান্ড পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত হয়ে যায়। কারণ তারা যোগ্য লোক নেয়নি। তাছাড়া স্বার্থের দ্বন্দ্বও ছিল। এ কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেন। এ কারণে আমাদের ভুগতে হচ্ছে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে না আসার কারণ কী?

প্রথমত, তাদের মূলধনের প্রয়োজন নেই। তারা হয়তো যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে ৪ বা ৫ শতাংশ সুদে একটা বন্ড ইস্যু করেছে। ওই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ঝুঁকিও একটি কারণ হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর জন্য মূলধনের খরচও বেশি। স্থানীয় কোম্পানির তুলনায় বহুজাতিকগুলো বিষয়টা খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। ফলে সাধারণত তারা পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। আরো কারণ আছে। আপনি যখন পুঁজিবাজারে আসবেন, আপনাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারাতে হবে। পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য অনেক কমপ্লায়েন্স ইস্যু আছে। যেমন আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুসারে ত্রৈমাসিক অ-আর্থিক প্রতিবেদন সংক্ষিপ্ত আকারের হবে। কিন্তু আমাদের এখানে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে বিশদ আকারে আর্থিক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ হয় না। পুরো প্রান্তিকে কোম্পানির স্থায়ী সম্পদে যে সংযোজন হয়েছে সে তথ্য চাওয়া হয়। ব্যাংকের লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়। এগুলো দেখার পরে কিন্তু সবাই শঙ্কিত হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে শেয়ারদর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। এটা তাদের পারফরম্যান্সের প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে শেয়ারের সঠিক মূল্য নির্ধারণ হয় না। আবার ভালো শেয়ারের লেনদেনও কম হয়। কারণ এখানে বাজার খুচরা বিনিয়োগকারীকেন্দ্রিক। এতে শেয়ারের সঠিক মূল্য নির্ধারণ হবে কিনা এ নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। সবশেষে আরেকটা প্রশ্ন আসে, তারা এখানে কেন আসবেন। কী প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে? বার্জার পেইন্টসের রাইট শেয়ারের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে অনুমোদন পেতে দুই বছর সময় লেগেছে। এসব বিষয় দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই অন্যরা এখানে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন। বিধিবিধানগুলো অনেক সহজ করতে হবে। আরো বেশি প্রণোদনা দিতে হবে। ধরেন ৫ শতাংশ কর ছাড় দেয়ার মাধ্যমে কার্যকর করহার কমালেন। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের অগ্রহণযোগ্য ব্যয় যোগ করার কারণে করহার ৩০ শতাংশে নিয়ে যাচ্ছেন। এটার তো দরকার নেই। পুঁজিবাজারে এলে রিপোর্টিং আরো সহজ করে দেয়া, কর নিরীক্ষা হবে খুব নির্দিষ্ট, অতিরিক্ত হবে না—এ ধরনের প্রণোদনা দেয়া হলে কোম্পানিগুলো আসতে আগ্রহী হবে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অ-আর্থিক প্রতিবেদনের মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোম্পানিগুলো বছরে পর বছর ধরে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

একটি কোম্পানি সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করলে প্রথমত, সে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যাবে। তারপর আর্থিক প্রতিবেদন না দেয়ার কারণে বিএসইসি জরিমানা করবে। গত এক বছরে অহরহ জরিমানা হচ্ছে। কিন্তু জরিমানা আরোপ করলেই তো হবে না, টাকা আদায় হচ্ছে কি? না হওয়ার কারণ হচ্ছে আমাদের আদালত ব্যবস্থা। যেকোনো মামলা গেলে বছরের পর বছর চলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা খুব ভালো ধারণা এসেছিল—বাণিজ্যিক আদালতের ধারণা। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। হয় বাণিজ্যিক আদালত, অথবা বাণিজ্যিক মামলার জন্য আলাদা বেঞ্চ। এটা করলে অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যেত। আইনের প্রয়োগ যখন করতে যাব, নিশ্চিত করতে হবে সেটা যেন শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়। অর্ধেক পথে আটকে গেলে হবে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে এমনভাবে চালু করতে হবে, যাতে আমি পুরো বাস্তবায়ন করতে পারি। এখন আসি আর্থিক প্রতিবেদনের মানের বিষয়ে। ঐতিহাসিকভাবে নিরীক্ষার বিষয়টা কী ছিল? আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করা তাই তো? কিন্তু এখন প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। কারণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বড় অংশ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। কারণ একটা আর্থিক বিবরণীর মেরুদণ্ড হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্তিশালী। এটা শক্তিশালী হলে অন্তত আমি একটা ধারণা পাই যে ম্যানেজমেন্ট যে রিপোর্টটা তৈরি করেছে, সেটা কিছুটা নির্ভরযোগ্য। আরেকটা বিষয় আছে সেটা হচ্ছে স্থানীয় কোম্পানি বনাম বহুজাতিক কোম্পানি। আমরা একটা কথা বলে থাকি—করপোরেট সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার পৃথক্‌করণ। যদি মালিক আর ব্যবস্থাপনা এক হয়ে যায়, তাহলে স্বার্থের সংঘাত হবে। মালিক যদি দেখেন এখানে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে, তাহলে তিনি সিস্টেমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন। ব্যাংকের কথাই ধরা যাক। যেসব ব্যাংকের করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী, তারা ভালো করেছে। যাদেরটা শক্তিশালী না, তাদের অবস্থা আজকে আমরা দেখতেই পাচ্ছি। যারা নিরীক্ষা করেন তাদের সতর্ক থাকতে হবে। যদি দেখা যায় মালিকেরা প্রতিদিন ব্যবসায় বসছেন, আপনাকে বুঝতে হবে আর্থিক বিবরণী গ্রহণ করার আগে খুব সতর্ক হতে হবে। প্রথম স্তর হচ্ছে করপোরেট সুশাসন। আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয়টি পর্ষদের দায়িত্ব। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। তৃতীয় স্তর নিরীক্ষক এবং চতুর্থ স্তর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু তারা কী করছিলেন? বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি কী করেছে? কেউ তো কিছু করেনি তখন।

ওয়াচডগ হিসেবে তো নিয়ন্ত্রক সংস্থারই ভূমিকা পালন করার কথা...

শেষ পর্যন্ত তো তাদেরই দেখার দায়িত্ব। আমরা নিরীক্ষকদের দোষ দিই। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই নিরীক্ষকদের দায় আছে। কিন্তু একটা বিষয় কেউ মাথায় আনে না—ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি। ওদের কথাও আমরা ভাবি না। কিন্তু তাদেরও দায় আছে। এখন যে ব্যাংকগুলো ধসে গেছে, এগুলোর ক্ষেত্রে তারা খুব ভালো রেটিং দিয়েছিল। কেউ কি প্রশ্ন করছে, কীভাবে দিলেন? নিরীক্ষকেরা বড় পক্ষ, তাই তাদের ধরা হয়। গত এক বছরে আমি দেখেছি আইসিএবি এটা নিয়ে কাজ করছে। আমি নিজেও কিছুটা যুক্তও আছি। তারা কাজ করছে। ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হচ্ছে আস্থা। আমরা তো নিরীক্ষকদের প্রত্যয়ন দেখেই বিনিয়োগ করছি। যদি এ আস্থা না থাকে, তাহলে আমি কার ওপর আস্থা রাখব? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও এখানে বড় ভূমিকা আছে।

বিনিয়োগ করার আগে কোন বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়ন করা উচিত?

আমরা যখন সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে বিনিয়োগ করি, আমি কেন বিনিয়োগ করছি? দুইটা কারণে করছি। একটা মূলধনি মুনাফা, আরেকটা লভ্যাংশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে আমরা অনেক সময় রাতারাতি বড়লোক হতে চাই। উৎপাদন বন্ধ থাকা একটা কোম্পানির শেয়ারের দাম কেন বাড়বে? কারণ বলা হচ্ছে, এর বাজারমূল্য কম, ওরা অলরেডি শেয়ারটা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে তাই দাম বাড়বে। আমরা এটাকে বলি ‘হার্ডিং ইফেক্ট’। গরুর পালের মতো। সবাই যখন দৌড়ায়, আমিও দৌড়াই। কখন কিনি? যখন দাম বাড়ছে। যখন দাম বাড়ছে, সবার মতো সে কিনছে। আর যখন দাম কমে, হুড়মুড় করে সবাই বিক্রি করে দেয়। কিন্তু প্রথম বিষয় হচ্ছে, এটা ভুল কৌশল। দ্বিতীয়ত, আপনি তো শেয়ার মার্কেট বোঝেন না। এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিউচুয়াল ফান্ডে আস্থা কম। তাহলে অন্তত এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, যারা শেয়ার মার্কেটটা বোঝে। আর খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে, দয়া করে এমন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন না যাদের কারখানা বন্ধ, বা যারা অনিয়ম করছে। যাদের উদ্দেশ্যই ভালো না, তারা যখন অনিয়ম করছে, তার মানে তাদের উদ্দেশ্য খারাপ। তারা লভ্যাংশ দিতে চায় না। এমনকি লভ্যাংশ ঘোষণা করার পরেও টাকা দিচ্ছে না। আপনি কেন ওই শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন? কারণ একটা হচ্ছে মূলধনি মুনাফা, যেটা অনিশ্চিত। আমরা বলি, ঝুঁকি মানেই অনিশ্চয়তা। মূলধনি মুনাফা হতে পারে, আবার লোকসানও হতে পারে। কিন্তু লভ্যাংশ তুলনামূলক নিশ্চিত। আমি যদি দেখি একটা কোম্পানি কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ভালো লভ্যাংশ দিয়ে আসছে, ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে, তাহলে অন্তত আমি জানি, এই টাকাটা পাব। হ্যাঁ, পুঁজিবাজার পড়ে যেতে পারে। কিন্তু লভ্যাংশ তো পাব। একটা নিরাপত্তা আছে যে অন্তত কিছু একটা পাব। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুরোধ নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করেন। যে কোম্পানির শেয়ার কিনছেন, এর ভিত্তি কী? এটা কি চালু কোম্পানি, নাকি বন্ধ? নিয়মিত নাকি অনিয়মিত? এগুলো যাচাই করে কিনবেন। আর শেয়ার কিনবেন দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য যদি নামেন, তাহলে কিন্তু ধরা খেতেও পারেন।

বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বর্তমানে ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ভোক্তা চাহিদাও কমেছে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

আমরা যখন ব্যবসা করি, একটা ইকোসিস্টেমে কাজ করি। যেটাকে বলি ‘এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’। সবকিছু কি আপনাকে সহায়তা করছে, নাকি বাধা দিচ্ছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত কয়েক বছর এটা আমাদের সহায়তা করেনি। শুরু হয়েছিল কভিড পরিস্থিতি দিয়ে। ওখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা হলো। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্ট এসে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আরো অস্থিরতা তৈরি করলেন। বিশ্ব বাণিজ্য মোটামুটি ভেঙে পড়েছে। একসময় আমরা বলতাম, বাইরে বাণিজ্য করতে হবে। এখন সবাই চিন্তা করছে, আমি কীভাবে আমার সীমানা রক্ষা করব। অর্থাৎ বাইরের পরিবেশ আমাদের সাহায্য করছে না। এখন আসি অভ্যন্তরীণ পরিবেশে। মূল্যস্ফীতি কয়েক বছর ধরে কমছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে অর্থনীতি গতিকে ধীর করে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ল। কর্মসংস্থান কমে গেল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনৈতিক চক্রে। তখন মানুষের খরচ করার পরিমাণ কমে যায়। এ চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে এখনো আমরা বহন করছি। নতুন সরকার এসে তো রাতারাতি সবকিছু বদলাতে পারবে না। অন্যদিকে যেকোনো কোম্পানি নিজের টাকায় ব্যবসা করে না, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে করে। এখন সুদের হারও বেশি। অন্যদিকে সরকারও ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে, কারণ রাজস্ব ঘাটতি আছে। ফলে শিল্প খাতের জন্য ঋণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একদিকে ঋণের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতি ধীর, মানুষ খরচ কমাচ্ছে। আবার শিল্পের জন্য জ্বালানি পাওয়াও একটা বড় সমস্যা। সব মিলিয়ে আজকের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বহুজাতিক কোম্পানির পর্ষদে বসার কারণে আপনার সঙ্গে তো কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয়ের নিয়মিত যোগাযোগ হয়। বাংলাদেশ সম্পর্কে এখানকার ব্যবসার পরিবেশের বিষয়টি তারা কীভাবে দেখছেন?

সত্যি কথা বলতে, খুব বেশি ইতিবাচক না। একটা উদাহরণ দিই। বিএটিবিসির পর্ষদে আমি আছি। এখানে যেটা দেখা যাচ্ছে, করের হার অনেক বেশি। কিন্তু বছরের পর বছর আমরা যেটা লক্ষ করছি, অবৈধ সিগারেটের বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। কেন? কারণ কর এত বেশি হলে প্রলোভন থাকে, আমি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা করব। সিগারেটের ক্ষেত্রে ৬ টাকার একটা মূল্যস্তর আছে, যেটা এনবিআর অনুমোদন করেছে, প্রতি শলাকা। আপনি যদি হিসাব করেন, ৬ টাকায় লাভ করা সম্ভব না। লোকসান হবেই। কারণ বিক্রয়মূল্য থেকে ভ্যাট বাদ দিলে যা থাকে, তার মধ্যে উৎপাদন খরচ বাদ দিলে বিশাল লোকসান। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে যারা ৬ টাকায় বিক্রি করছে, তারা করছে কীভাবে? আমরা হিসাব করে দেখেছি, গত কয়েক বছরে সরকার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। বিএটিবিসির পক্ষ থেকে একটা ভালো প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল যে প্রতিটি যন্ত্রে কাউন্টার বসিয়ে দেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি গণনা হবে এবং এনবিআরের সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। তাহলে সমস্যা অনেক কমে যাবে। বিএটিবিসি ছাড়া অন্য তামাক কোম্পানিগুলো বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) আওতাধীন নয়। সব কোম্পানিকে এর অধীনে নিয়ে আসতে হবে, যাতে কেউ বাদ না থাকে। এসব বিষয় নিয়েই পর্ষদে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়। কেন সরকার এ বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নিচ্ছে না? আমরা কর দিতে চাই, সমস্যা নেই। কিন্তু বর্তমান আয়কর ব্যবস্থায় মনে হয় যারা কর দিচ্ছে, তাদেরই আরো ধরা হচ্ছে। যারা দিচ্ছে না, তারা আরামে আছে। কেন সরকার সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে না? কেন স্থানীয় কোম্পানিকে রক্ষা করতে গিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষতি হচ্ছে? এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।

তাহলে কি বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ বহুজাতিকগুলোর জন্য দিন দিন আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে?

একসময় আমি জিএসকের চেয়ারম্যান ছিলাম। জিএসকের প্রধান ব্যবসা ছিল ফার্মাসিউটিক্যালস ও হরলিকস। ২০১৯ সালে শেষ পর্যন্ত জিএসকে ৬০ বছর ব্যবসা করার পরে ফার্মাসিউটিক্যালস ব্যবসা বন্ধ করে দিল। এটা একটা ক্ল্যাসিক উদাহরণ, যেখানে তারা সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ পায়নি। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। আমি বারবার একটা জায়গায় ফিরে আসি। সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। তা না হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাজারে থাকবে না, নতুনরাও আসবে না।

সামনে নতুন বাজেট আসছে। কোন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যবসার পরিবেশ ও পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমাদের যে অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সংস্কৃতি আছে, সেটা থেকে বের হতে হবে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে। আরেকটা বড় বিষয়, সরকারকে উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় করতেই হবে। যদি অর্থনীতিকে আবার সচল করতে হয়, তাহলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে। কারণ সেখান থেকেই চাকরি তৈরি হয়। কিন্তু কীভাবে করবেন? সরাসরি কর বাড়িয়ে না। যত বেশি সম্ভব বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে। মিউনিসিপল বন্ড, অবকাঠামো বন্ড ইস্যু করা যেতে পারে। তাহলে মানুষ সরাসরি বিনিয়োগ করবে। সরকারের ওপর চাপ কমবে। আরেকটা বড় ইস্যু হচ্ছে, এনবিআরের নীতি প্রণয়ন আর রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম আলাদা করা। এটা খুব জরুরি। না হলে স্বার্থের সংঘাত থেকেই যাবে। আমি যেটা বলার চেষ্টা করছি, আমাদের সম্পদ সীমিত। অর্থনীতি ধীর। অর্থনীতি বড় না হলে রাজস্বও বাড়বে না। অর্থনীতি বাড়াতে হলে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আর বাজেট অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে।

বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের কী করা প্রয়োজন?

আমাদের এখানে শিল্প স্থাপন করতে চাইলে প্রথম চ্যালেঞ্জ জমি। হয়তো আপনি ইপিজেডে যাচ্ছেন। কিন্তু গ্যাস সংযোগ পাচ্ছেন না, বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছেন না। এরপর শুরু হয় লাইসেন্স। এতগুলো আলাদা লাইসেন্স কেন? কেন এমন হবে না যে আমি এক জায়গায় আবেদন করলাম, আর সেখান থেকেই সবকিছু সমন্বয় করে দিল? আমি বলব না যে শুধু কর প্রণোদনা দেন, পাশাপাশি ব্যবসা করা সহজ করতে হবে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এখানে খুব ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন হয়, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভয় পাইয়ে দেয়। বিনিয়োগ নিজেই একটা অনিশ্চয়তা। তার ওপর যদি বারবার নীতি পরিবর্তন হয়, তাহলে অনিশ্চয়তা আরো বেড়ে যায়।

আরও