ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখা এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। এ সময় নদীতে জাল ফেলা বন্ধ থাকায় ইলিশের ডিম ছাড়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা মাছের মজুদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞার সুফল টেকসই করতে জেলেদেরও এ সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হয়। তবে তাদের আয় বন্ধ থাকায় জীবিকা নির্বাহে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এ সময়ের জন্য নিবন্ধিত জেলেদের ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হলেও অনেকের অভিযোগ, ২২ দিনের সংসারের প্রয়োজন মেটাতে এ সহায়তা যথেষ্ট নয়। জেলেরা বলছেন, চাল দিয়ে পরিবারের ভাতের চাহিদার একটি অংশ মেটানো গেলেও তেল, ডাল, লবণ, চিকিৎসা, সন্তানদের খরচ, ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে এ সময় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক জেলে পরিবারকে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার আনন্দবাজারের জেলে লিটন হোসেন। নদীতে মাছ ধরেই তার সংসার চলে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন সেই আয়ের পথ বন্ধ থাকে। এ সময়ে সরকারি চাল কিছুটা সহায়তা করলেও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয় বলে জানান তিনি। লিটনের দাবি, চালের পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হলে সংসারের প্রয়োজন মেটানো সহজ হতো।
একই দাবি রিপন হোসেনেরও। তিনি বলেন, ‘চাল দিয়ে ভাতের ব্যবস্থা করা গেলেও রান্নার তেল, ডাল, লবণসহ অন্যান্য পণ্য কিনতে টাকা লাগে। অনেকেরই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। ফলে মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময়টিতে শুধু খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো কঠিন।’
চাঁদপুরের চার উপজেলায় প্রথম দফায় ৪১ হাজার ৩৯০ জন জেলের জন্য ১ হাজার ৩৪ দশমিক ৭৫ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের উদ্যোগে আরো ১ হাজার ৪০০ জেলের জন্য ৩৫ টন চাল বরাদ্দ যোগ হয়। সব মিলিয়ে সরকারি সহায়তার আওতায় আসেন ৪২ হাজার ৭৯০ জন জেলে।
তবে জেলেদের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞার সময়ে কেউ জাল ও নৌকা মেরামত করেন, কেউ কৃষিকাজ বা দিনমজুরি করেন, আবার কেউ রিকশা, অটোরিকশা কিংবা ভ্যান চালিয়ে আয় করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সবসময় কাজ পাওয়া যায় না। আয় হলেও তা সংসারের সব খরচ ও ঋণের কিস্তি মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
আনন্দবাজারের জেলেপল্লীতে নিষেধাজ্ঞার সময়ে নৌকা তীরে পড়ে থাকে। জাল মেরামত ও নৌকা ঠিকঠাক করার কাজ চলে। এসব কাজের জন্যও কখনো কখনো অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে সংসারের খরচের সঙ্গে পেশা টিকিয়ে রাখার ব্যয়ও জেলেদের চিন্তায় যোগ হয়।
সহায়তা বণ্টন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। আনন্দবাজারে নিবন্ধিত অনেক জেলে চালের কার্ড পেলেও নিষেধাজ্ঞা শুরুর ১০ দিন পরও চাল পাননি বলে জানিয়েছেন। আবার প্রকৃত জেলে হয়েও নিবন্ধনের বাইরে থাকায় সরকারি সহায়তা থেকে বাদ পড়েছেন এমন তরুণের সংখ্যাও কম নয়। রাকিব, দিল মোহাম্মদ, নয়ন দেওয়ান, নুর মোহাম্মদ, হাবিব মোল্লা, জাহিদ ঢালী, জাকির গাজীসহ কয়েকজন তরুণ নিয়মিত নদীতে মাছ ধরেন, কিন্তু জেলে তালিকায় নাম না থাকায় সহায়তা পাচ্ছেন না বলে তাদের দাবি।
আনন্দবাজারে জেলে পরিবার রয়েছে ২৯৫টি; সেখানে জেলের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫৫ বলে স্থানীয়ভাবে জানানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকায় প্রকৃত জেলেদের সবাই অন্তর্ভুক্ত হননি। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় যাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়, তাদের একাংশ সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘চাল বিতরণ কার্যক্রম সঠিকভাবে চলছে এবং এ বিষয়ে জেলা কার্যালয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। বর্তমানে নিবন্ধিত জেলেদের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে।’ তবে নগদ অর্থ সহায়তা জেলেদের জন্য উপকারী হতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেন। নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলা টাস্কফোর্সের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে জেলেদের ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা জরুরি; একই সঙ্গে জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।’