চুয়াডাঙ্গা প্রধান ডাকঘর

কয়েক দফা সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে শেষ হয়নি নির্মাণকাজ

চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারে ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬০ সালে। ১৯৭০ সালে সম্প্রসারণ করা হয় পুরনো ভবন।

চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারে ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬০ সালে। ১৯৭০ সালে সম্প্রসারণ করা হয় পুরনো ভবন। এরপর আর সংস্কার করা হয়নি। সেটিতে ফাটল ধরেছে অনেক আগেই। তবে ভবনটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ না করে সেটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর কয়েক দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এক্ষেত্রে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে কোটি ৭৪ লাখ টাকা। সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা পুরোপুরি হয়নি। মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজটি কিনে নেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি খুস্তার জামিল। আগস্টের পর তিনিও গা-ঢাকা দিয়েছেন।

ডাকঘরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের সঙ্গে অন্য জেলার ডাকঘরগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে আগেই। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা ডাকঘর নির্মাণ শেষ হয়নি। নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ডাক বিভাগে কর্মরতদের। সাধারণ গ্রাহকও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বসার জায়গা তো দূরের কথা ডাকঘরের মধ্যে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা নেই। গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। সেবা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় গ্রাহকও কমছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পাতলা ইট আর চুন-সুরকির গাঁথুনিতে ভবনটি তৈরি হয় ১৬৩ বছর আগে। ১৯৮৪ সালে ছয় বিঘা জমির ওপর পূর্ণাঙ্গভাবে প্রধান ডাকঘরের কার্যক্রম চালু হয় ২৪ জন স্টাফ নিয়ে। তবে সংস্কার না করায় পুরনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অবস্থায় ভবনটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। ঝালকাঠির নলছটি উপজেলার মাহফুজ খান লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ পায়। প্রথম পর্যায়ে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুলাইয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজটি কিনে নেন চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি খুস্তার জামিল। নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পর আবারো নির্মাণকাজ শুরু করেন নতুন ঠিকাদার। ২০২১ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজ চলমান থাকা অবস্থায় ঠিকাদার খুস্তার জামিল সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনের দেয়া ডিও লেটার ব্যবহার করে ব্যয় বাড়িয়ে নেন। এর আগে ব্যয় বাড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাড়ালে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় কোটি ৭৪ লাখ টাকা। বর্ধিত বরাদ্দের পরও কাজ শেষ হয়নি।

ব্যাপারে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মাহফুজ খানের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। কারণে তার মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় ঠিকাদার খুস্তার জামিলের ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

ডাকঘরের কয়েকজন গ্রাহক জানান, পুরনো ভবনে ফাটল ধরেছে। ছাদের পলেস্তারা ধসে পড়ছে। ডাকঘরের স্টাফ সাধারণ গ্রাহক দুর্ঘটনার শঙ্কায় রয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। স্থানীয় ঠিকাদার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি খুস্তার জামিল মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজটি কিনে নেন। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে রেখেছেন। বারবার কাজের মেয়াদ শেষ হলেও কৌশলে তা বাড়িয়ে নিয়েছেন। বর্ধিত সময়ের চেয়ে দুই মাস বেশি অতিবাহিত হলেও এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গা-ঢাকা দিয়েছেন খুস্তার জামিল।

চুয়াডাঙ্গা ডাকঘরে সেবা নিতে আসা গ্রাহক জেসমিন খাতুন মসলেম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভবনটি অনেক পুরনো। ভেতরে প্রবেশ করলেই ভয় লাগে, কখন ভেঙে পড়ে মাথার ওপর। বসা দাঁড়ানোর মতো কোনো জায়গা নেই। ভেতরের পরিবেশ নোংরা। এখানে প্রয়োজনীয় কাজে আসি, কিন্তু পরিবেশ দেখে আসতে ইচ্ছা হয় না।

চুয়াডাঙ্গা প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার রিয়াজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্য জেলায় পোস্ট অফিস নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে আরো আগেই। তবে চুয়াডাঙ্গা ডাকঘরের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ১৯৭০ সালে নির্মিত ভবনটিতে কার্যক্রম চলছে। ভবনের ছাদ ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণকাজ মন্থর গতিতে চলছে। দ্রুত নতুন ভবনে যাওয়াটা জরুরি  হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় বা অফিসের নথিপত্র রয়েছে, তা যদি কোনো কারণে চুরি বা প্রকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয় তাহলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

আরও